Sunday April11,2021

দোহাই লাগে- আমাকে কেউ রাজনীতিক ভাববেন না, আর এখন রাজনীতি করার সময়ও নয়। এখন আমি করোনা প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছি এবং বাসায় অবস্থান করছি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে আমাদের ভবনের যৌথ তহবিল থেকে আশেপাশে বসবাসকারী কিছু দরিদ্র পরিবারের মধ্যে যৎসামান্য অর্থ বিতরণ করে মানবিকতা প্রকাশের চেষ্টা করে যাচ্ছি। এছাড়া মোবাইল ফোনে নিকটআত্মীয় ও বন্ধুবান্ধবদের খোঁজখবর রাখছি। সৃষ্টিকর্তা তার সৃষ্টিকে অবশ্যই রক্ষা করবেন একথায় বিশ্বাস রাখছি। আর আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে বঙ্গবন্ধু কন্যা সময়ের কাজ সময়ে করতে জানেন। এজন্যই আজ বেগম খালেদা জিয়া মুক্ত। কাজেই করোনা যুদ্ধে আমাদের সবাইকে সামিল হতে হবে। মনে রাখতে হবে আমরা ‘৭১ এ যুদ্ধ করেছি চেনা শত্রুর বিরুদ্ধে, আজকের যুদ্ধের শত্রু অচেনা- খালি চোখে দেখা যায় না। এজন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। যেখানে উন্নত দেশের সরকার ও স্বাস্থ্যকর্মীগণ করোনাযুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে আকাশের দিকে চেয়ে আছেন, সেখানে আমাদের অবস্থা তো নস্যি।

প্রথম কথায় আবার ফিরে আসি। আমি এখন রাজনীতিক নই-  উন্নয়ন কর্মী। যখন বয়সে অপরিপক্ব ছিলাম, তখন রাজনীতিতে পরিপক্ব ছিলাম। আমার কাছে মনে হয় বঙ্গবন্ধুকে ভালবাসা আর আওয়ামীলীগ করা এক নয়। একটু ব্যাখ্যা করে বলি, ‘৭৫ এর ১৫ই আগস্ট সকালবেলা, সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠেছি, বাবা তখনও ঘুমাচ্ছেন। হঠাৎ করে আমাদের গ্রামের ‘পাশা’ নামে আব্বার এক ছাত্র এবং ভক্ত রেডিও হাতে দৌড়ে আসলেন। বাড়িতে ঢুকেই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, স্যার কোথায়? আমার জবাবের অপেক্ষা না করেই ঘরে ঢুকে আব্বাকে ঘুম থেকে জাগালেন এবং রেডিও অন করলেন। আব্বা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন এবং একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “যে দেশে বঙ্গবন্ধু নাই, সে দেশে শরীফ মাস্টার বাঁচতে চায় না”। এখানেই আওয়ামীলীগ করা আর বঙ্গবন্ধুকে ভালবাসার মধ্যে পার্থক্য। যাক, সৃষ্টিকর্তা সেসময়ে মনে হয় কাগজ-কলম নিয়েই বসে ছিলেন- আব্বার বেঁচে না থাকার আকুতি সাথে সাথেই মঞ্জুর করলেন। আর আজরাইল বাহিনী (গণবাহিনী)  ২৭শে অক্টোবর, ১৯৭৫ তারিখে তাঁকে  খতম করে সে দায়িত্ব সম্পন্ন করলো।  আমি তখন টাঙ্গাইলের শিবনাথ স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ি। বড়ভাই দশম শ্রেণিতে। কি করব, কিভাবে সাত সদস্য বিশিষ্ট সংসার চলবে সেটাই প্রধান ভাবনা। কোন আত্মীয়স্বজন বা নেতানেত্রী কাউকেই পাশে পেলাম না। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলাম ট্রাকের ‘হেল্পার’ হব। গ্রামের এক ট্রাক ড্রাইভারের সাথে কথাও বললাম। সে জানালো ছয়মাসের মধ্যেই ড্রাইভার বানিয়ে দিতে পারবে। এঅবস্থায় স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিলাম।

সপ্তাহ খানেক পরের কথা। এক  সন্ধ্যায় শিবনাথ স্কুল থেকে আনোয়ার স্যার ও কদ্দুস স্যার আমাদের বাড়িতে এলেন। প্রধান শিক্ষক লতিফ স্যার আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। পরদিন হেডস্যারের সাথে দেখা করলাম। তার কথায় জোনাকির আলোর মত একটা আলোর ঝলকানির সন্ধান পেলাম। তিনি বললেন স্কুলে পড়তে আমাকে কোন বেতন দিতে হবে না। চঞ্চলনন্দীসহ আরও কয়েকজন স্যার বললেন, প্রাইভেট পড়তে চাইলেও আমাকে কোন টাকা দিতে হবে না (আমার নেক আমল কর্তন করেও যেন তাঁরা বেহেস্তবাসী হয়)। বাড়িতে এসে মাকে এসব জানালাম। মা বললেন লেখাপড়ার পাশাপাশি দু-একটা টিউশনি করো। প্রয়োজনে বাড়িঘর সব বিক্রি করে হলেও লেখাপড়া চালিয়ে যাও। এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল। ‘৭৭ সালে এসএসসি পাশ করে করটিয়া কলেজে ভর্তি হলাম। বয়স বাড়ার সাথে সাথে মনোবলও বাড়তে লাগল। এরপর দেশে রাজনীতি উন্মুক্ত হল। মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানীর ন্যাপসহ অনেকদল মিলে বিএনপি গঠিত হল। উল্লেখ্য আমাদের মজলুম জননেতা সারাজীবন ক্ষমতা থেকে নিরাপদ  দূরত্ব বজায় রেখে রাজনীতি করতেন। রেগে গেলে ‘খামোশ’ বলতেন, দাবী আদায়ের জন্য অনশন করতেন। কিন্তু তার প্রিয় ‘মজিবর’ এভাবে নিহত হওয়ার পরও কেন যে নিশ্চুপ থাকলেন সেটা গবেষণার বিষয়। মাওলানা ভাষানীর মৃত্যুর পর ন্যাপের নেতৃবৃন্দ মন্ত্রীসহ বিভিন্ন উচ্চপদে আসীন হলেন। ‘৭৯ সালে সাধারণ নির্বাচন এল। আমি তখন পরিপক্ব রাজনীতিবিদ। আমাদের ঘারিন্দা ইউনিয়নে আওয়ামীলীগের একটা কমিটি গঠন করে দেয়ার দায়িত্ব পরল আমার উপর। কিন্তু কেউ কমিটির সভাপতি হতে রাজি হলেন না। কেননা, ‘৭২-‘৭৫ সময়ে অত্র ইউনিয়নসহ  আশেপাশের ইউনিয়নে আওয়ামীলীগের সভাপতিদের জাসদ গণবাহিনী হত্যা করেছে, সেই আতংক এখনও সবার মধ্যে বিরাজমান রয়েছে। শেষ পর্যন্ত জোয়াইর স্কুলের শিক্ষক জনাব সাদেক মাস্টারকে অনেকটা জোর করেই সভাপতি বানিয়ে কমিটি ঘোষণা করলাম। সেক্ষেত্রে, ‘৭৫ পরবর্তী ঘারিন্দা ইউনিয়নের আওয়ামীলীগ আমার হাতে পুনরুজ্জীবিত হল- এটা দাবী করতেই পারি। কমিটি গঠন শেষে বাড়ী ফিরলাম, দেখি বড়মামা রাগান্বিত স্বরে মায়ের সাথে কথা বলছেন। আমাকে দেখেই উত্তেজিত হয়ে বললেন, বঙ্গবন্ধু-বঙ্গবন্ধু করে তো বাবাকে খেয়েছো, এবার নিজেকে খাওয়ারও জোগাড় করতেছো। এবিষয়ে যা জানলাম তার সারসংক্ষেপ হল, টাঙ্গাইলের বিএনপিতে যোগ দেয়া ন্যাপ নেতা জনাব আবদুর রহমান (পরবর্তীতে মন্ত্রী)  এ আসনে নির্বাচন করবেন। প্রতিপক্ষ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা এবং আওয়ামীলীগের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব আবদুল মান্নান। এজন্য রহমান সাহেবকে আঁটঘাঁট  বেঁধেই নির্বাচনে নামতে হবে বিধায় বাসায় জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। উক্ত বৈঠকে নির্বাচনী এলাকার গ্রাম সরকারসহ আওয়ামীবিরোধী প্রভাবশালীদের ডেকেছেন। আমাদের গ্রামের নির্বাচনের অবস্থা জানতে চাইলে প্রভাবশালীদের একজন (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) প্রস্তাব করলেন, আমাদের কেন্দ্রে ধানের শীষকে জেতাতে হলে শরীফ মাস্টারের দুই ছেলেকে গ্রেফতার করতে হবে। ওরা ছাড়া এলাকায় আওয়ামীলীগ করার মত সাহস কারো নেই। বিএনপি প্রার্থী আবদুর রহমানের প্রতিবেশী হিসেবে মামা সেখানে উপস্থিত থেকেও ভাগিনাদের গ্রেফতারের বিরোধিতা করতে ব্যর্থ হলেন। এবারও সৃষ্টিকর্তা কাগজ-কলম নিয়ে বসে ছিলেন। ন্যাপ নেতা  আবদুর রহমান সাহেবের সাথে আব্বার একটা সখ্যতা ছিল। এমন সময়ে উক্ত বৈঠকে রহমান সাহেব বলে বসলেন আমি চাই ওরা আওয়ামীলীগই করুক- সবাই নীতিভ্রষ্ট হলে দেশটা চলবে কি করে? এভাবে সে যাত্রায় বেঁচে গেলাম।

এরপরের ঘটনা।  উক্ত নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে টাঙ্গাইল আওয়ামীলীগের প্রাণপুরুষ জনাব আবদুল মান্নান আমাদের বাড়িতে এলেন। মা তাঁকে ধরে অনেক কান্নাকাটি করলেন। মান্নান চাচা আমাদেরও খোঁজখবর নিলেন। তাঁকে চা খাওয়ানোর মত জোগাড়ও তখন আমাদের বাড়িতে ছিল না। তিনি ভোটের ব্যাপারে আমাদের কিছুই বললেন না। শুধু বললেন ভাবীর (আমার মা) কাছে দোয়া নিতে এসেছিলাম- বলেই চলে গেলেন। মান্নান সাহেবের মুখে বাবার প্রতিচ্ছবি দেখলাম (মান্নান সাহেবের মৃত্যুর পর আর কোন এমপি, মন্ত্রী বা আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ আমাদের বাড়িতে এসেছেন বলে মনে পড়ে না)। মামার কঠিন উপদেশ ভুলে গেলাম। একটা প্রতিবাদী মনোবল নিয়ে নির্বাচনে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। নির্বাচনে মান্নান সাহেব নৌকা মার্কা নিয়ে ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে হেরে গেলেও আমাদের কেন্দ্রে জিতে গেলেন- এতটুকু বিজয়েই মনে হল “কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না”।

এরপর করটিয়া কলেজে ছাত্রলীগের প্যানেলে দুইবার নির্বাচন করে দুইবারই হেরে গেলাম, সেই সাথে শারীরিক নির্যাতনও সহ্য করলাম। স্বল্প সময়ের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেও নিগৃহীত হলাম। এভাবে লেখাপড়া কোনরকমে শেষ করে চাকরীতে ঢুকলাম। তবে রাজনীতির নেশায় তিনবার চাকরী ছেড়ে বাড়ি ফিরে এলাম। রাজনীতির ব্যাপারে মায়ের আতংক তখনও কাটে নি, বরং আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। কেননা মা হয়ত হাড়েহাড়ে টের পেয়েছিলেন রাজনীতি থেকে নীতিটা হারিয়ে গেছে। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম ‘মা জিতে যাক’। রাজনীতি ছাড়লাম, এলাকা ছাড়লাম, আবার চাকরীতে ফিরে এলাম। তবে ফেলে আসা দিনগুলো এখনও আমায় পিছু ডাকে।

যাক, আমার ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়া শেষ পর্যায়ে। কর্মহীন বসে আছি বলেই হয়ত অতীত স্মৃতি রোমন্থন করছি। সবশেষে সবাইকে আবারও বিনয়ের সাথে বলছি ‘করোনাকে অবহেলা করোনা- এটা যেকোন সময়ে আপনকে পর করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে’।

 

91663269_240150133696901_6748236251649802240_n

জাহীদ হোসেন

সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, সরকারি সা’দত কলেজ, করোটিয়া, টাঙ্গাইল।