Friday April16,2021

সাম্প্রতিক কালে বহুল আলোচিত হয়ে উঠেছে ধর্ষণ। বাংলাদেশে প্রতিদিন কোনও না কোনও নারী ধর্ষণ হচ্ছে।ধর্ষণ সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে আমাদের জানা দরকার ধর্ষন বলতে আমরা কী বুঝি বা ধর্ষণ কী? ধর্ষণ বলতে আমরা যা বুঝি তাহলো কারো ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার সাথে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে যৌন তৃপ্তি লাভ করা। বর্তমান সমাজে অহরহই ঘটছে এমন লজ্জাজনক ঘটনা। নারীরা লাঞ্ছিত হচ্ছে যেখানে সেখানে আর দিন দিন বেড়েই চলেছে এমন ন্যাক্কাড়জনক কাজ। বর্তমান সমাজে আশঙ্কাজনক ভাবে বেড়ে যাচ্ছে ধর্ষণ। দেশে ধর্ষণ যেন থামছেই না। তুফানগতিতে চলছে। বলতে গেলে বাংলাদেশ এখন সবচেয়ে ধর্ষণপ্রবণ সমাজের একটি। ধর্ষন এখন ডাল-ভাতের মত হয়ে উটেছে। ধর্ষণ, ধর্ষক ও ধর্ষিতা এ শব্দগুলো শুনলে শরীর-মন ও চিন্তা-ভাবনা কেমন যেন হয়ে যায়। কেমন অনুভূতি তা বলে বুঝাতে পারবো না। শুধু বলতে পারি, অনুভূতিতে এক চরম আঘাত করে সব যেন চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। সৃষ্টিকর্তা বসবাসের জন্যে আমাদেরকে একটি সুন্দর পৃথিবী দিয়েছিন। বাসযোগ্য পৃথিবীতে সুন্দরভাবে বসবাস করার প্রয়োজনীয় সকল উপাদানও তিনি দিয়েছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, সেই সুন্দর পৃথিবী খুব দ্রুত বসবাসের অযোগ্য হতে চলেছে। সম্প্রতি আমি বেশ লক্ষ করছি, ধর্ষণ বিষয়ে আমাদের নাগরিক অনুভূতি এবং মানবিক অনুভূতি বেশ ভয়ানকভাবে লোপ পেয়েছে। ধর্ষণ এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে। এক দশক কিংবা দুই দশক আগে ধর্ষণ সমাজের চোখে একটা ‘বিরাট’ বা ‘জঘন্য’ ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হতো, সেটা এখন অনেকটা ‘গড়পড়তা ব্যাপার’ কিংবা ‘মামুলি বিষয়ে’ পরিণত হয়েছে বা পরিণত করে ফেলা হয়েছে। এইদেশে একটা দিনও বাদ যায়না যেদিন কোন ধর্ষণের ঘটনা পত্রিকার পাতায় প্রকাশ হয় না। আর অপ্রকাশিত শত ঘটনার কথা না হয় বাদই দিলাম। গোটা দেশ হয়ে উঠছে ধর্ষণের উপত্যকা অথচ সমাজের মানুষের মধ্যে এ নিয়ে কোনো বিকার নেই। সবাই বেমালুম নির্বিকার। গ্রামে কিংবা শহরে, বাড়িতে কিংবা রাস্তায়, অফিসে বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমনকি চলন্ত বাসে ধর্ষণ, দলবেঁধে ধর্ষণ, মাদ্রাসার পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী ধর্ষণ, কাজের মেয়েকে ধর্ষণ করে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া, মা-মেয়েকে এক সাথে ধর্ষণ, ঢাকায় চলন্ত বাসে আদিবাসী নারী ধর্ষিত, গার্মেন্টের কর্মী ধর্ষণ, প্রেমিক ও তার বন্ধু কর্তৃক প্রেমিকাকে ধর্ষণ, শশুরবাড়িতে বেড়াতে এসে নববধূ ধর্ষিত এ রকম অসংখ্য ধর্ষণের ঘটনা আমরা সংবাদপত্রে এবং ইলেকট্রিনক মিডিয়ায় হরহামেশা দেখে থাকি। একথায় বলা চলে প্রায় সর্বত্রই ঘটছে এমন ন্যাক্কাড় জনক ঘটনার। ধর্ষক বা নারী নিপীড়ক বলতে আমরা বুঝে থাকি অশিক্ষিত-নেশাখোর, চোর-ছ্যাচ্চর টাইপ লোকজনকে। আসলে তো বিষয় সেটি নয়। আমি মনে করি ধর্ষক মানেই হলো সুযোগ সন্ধানী বিকৃত মস্তিষ্ক। সুযোগ পেলেই এরা সাপের মতো ফণা তুলে ছোবল মারার চেষ্টা করে। আমাদের আত্মীয় বা কাছের মানুষ মাঝে কিছু কিছু বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ আছে। একই সাথে উঠাবসা করতে করতে সুযোগ বুঝে এক সময় ছোবল মারে। তাহলে কি বলবো যে, আমরা তাদেরকে সুযোগ দিচ্ছি বলেই তারা ধর্ষণ-নারী নির্যাতন করছে? একেবারেই না। আমরা অসচেতন, আমাদের পরিবার অসচেতন, আর এই অসচেতনতাকে পুঁজি করেই এইসব বিকৃত মস্তিষ্কগুলো সুযোগ খুঁজে বেড়ায়। আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন নারী ধর্ষিত হয় মানে একজন নারী শারীরীকভাবেই ধর্ষিত হয় না, গোটা সমাজ ধর্ষিত হয়। কারণ এ সমাজ একজন নারীকে ধর্ষকের হাত থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ ব্যর্থতার দায় আমাদের সবার এবং আমাদের নির্বিকার সামাজিক সেনসিটিভিটিই এর জন্য দায়ী। এটা অপ্রিয় হলেও সত্য যে, আমাদের সমাজের পুরুষদের একটা বড় অংশ এখনো নারীকে যৌন-লালসা মেটানোর যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করে। তাই, আমরা যতই আধুনিকতা, শিক্ষা এবং সভ্যতার মেকি চাঁদরে নিজেদের ঢেঁকে রাখার চেষ্টা করি না কেন, সমাজের আসল চেহারা এ অবিরাম ধর্ষণের ঘটনার ভেতর দিয়ে এভাবেই আমাদের সামনে হাজির হয়। কিছু কিছু পরিসংখ্যান বলে দেয় ধর্ষণ আমাদের দেশের একটা নিয়মিত ঘটনা। এই বাস্তবতা আমাদের সবার কম-বেশি জানা। বাংলাদেশে ধর্ষণের পরিসংখ্যান দেখলে যে কারোরই আঁতকে ওঠার কথা। সুস্থ মনের মানুষের ভীষণ কষ্ট পাওয়ার কথা এবং সেটাই হচ্ছে। অনেক দিন ধরে শুধু নীরবে চুপচাপ দেখেই যাচ্ছি। ভেবেছিলাম, অনেক মানুষই তো এ নিয়ে মিডিয়ায় ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলে, পাতার পর পাতা লিখে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওয়াল ভর্তি করে ধর্ষণের প্রতিবাদে এবং শাস্তির দাবিতে সোচ্চার হন। তাই এসব ঘটনা তো কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু দিন যতই যাচ্ছে ততই এসব ঘটনা কমা তো দূরের কথা দিন দিন আরো যেন বাড়ছে। তাই, নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে রাজধানীর কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে মিনারেল-ওয়াটারে গলা ভিজিয়ে আমরা যতই সেমিনার সিম্পোজিয়াম করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলি না কেন, বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় নারীর অবস্থানের এখন পর্যন্ত তেমন একটা ইতিবাচক-গুণগত পরিবর্তন হয়নি। প্রতিদিনের অসংখ্য ধর্ষণের ঘটনা আমাদের সেই ইঙ্গিতই দেয়। তবুও এর প্রতিবাদে মানুষের ঢল নামে না। প্রকৃত পক্ষে, সামগ্রিকভাবে ধর্ষণ বা নিপীড়নের বিরুদ্ধে যে একটা সম্মিলিত প্রতিবাদ, সেটি হতে দেখি না। বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থে ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের কোনও প্রতিবাদ চাওয়া হয় না। যেসব প্রতিবাদ হয়, সেগুলো ইস্যু ভিত্তিক।যে সব নিপীড়নের ঘটনা ইস্যু তৈরির ডিব্বা, সেসব ডিব্বার মুখ উন্মোচন করা হয়। বাকি ধর্ষণের ডিব্বাগুলো অতলে তলিয়ে যাক, কারও মাথা ব্যথা নেই। আমাদের সামনে তাই ধর্ষণের বিরুদ্ধে আরো একাট্টা হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই। সেই ধর্ষণ মনস্তত্ব তৈরিকারী পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধেও আমাদের কথা বলতে হবে। না হলে শুধু আইন বা বিচার দিয়ে একে ঠেকানো যাবে না। আর মনে রাখতে হবে, ধর্ষণের পক্ষে সাফাই গাওয়া, ধর্ষণের শিকার নারীর দোষ খোঁজা এক ধরনের ধর্ষণ মানসিকতা! আইনে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচারের বিধান থাকলেও ধর্ষণ মামলা শেষ হয় না। ধর্ষক বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়, হুমকি দেয়। জামিনে এসে আবার ধর্ষণ করে। যে দেশে যে সরকার ভয়াবহ জঙ্গী তৎপরতা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম ধর্ষণের বিরুদ্ধে সে সরকারের আন্তরিকতাই যথেষ্ট বলে আমি মনে করি। আমরা যদি এই আলোচনার সাধারণ কোন উপসংহারে পৌঁছতে চাই তা হলে বলা যায়, অন্যান্য অপরাধের মতো ধর্ষণের ঘটানাও মোকাবেলা করা সম্ভব, যদি আমরা কার্যকরভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারি। ইসলাম সহ কোন ধর্মেই ধর্ষনের মতো কাজকে উৎসাহিত করা হয়েনি। সুতরাং ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার উপর প্রবল গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ধর্মীয় অনুশাষন মেনে চলার মাধ্যমে নৈতিকতাবোধ সৃষ্টি ও নৈতিক অবক্ষয় রোধ করার মাধ্যমে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনোভাব সৃষ্টিই পারে ধর্ষণ প্রতিরোধে প্রধান ভূমিকা রাখতে। আমি মনে করি ধর্ষণ বন্ধে পুরুষকেই জাগতে হবে সবার আগে। তাদের বুঝতে হবে, নারীর পোশাক বা অন্য কিছু নয়, পুরুষের অনিয়ন্ত্রিত ও বিকৃত যৌন আকাঙ্ক্ষাই ধর্ষণের সবচেয়ে বড় কারণ এবং পুরুষের সবচেয়ে বড় অসুস্থতা। সবাই মিলে ধর্ষণের প্রতিরোধ ও প্রতিকারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করি। সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ধর্ষণের বিরুদ্ধে গর্জে উঠি। অনেক তো হলো, আর কত? এবার জাগুন পুরুষ বন্ধুরা। এতটুকু সৎ সাহস দেখান। লাগাম পড়ান নিজের বিকৃত যৌনাকাঙ্ক্ষায়। যতদিন পর্যন্ত না আপনারা নিজেরা নিজেদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন, ততদিন ধর্ষণের এই মহামারী বন্ধ হবে না। যতই আইন হোক, যতই কঠোর থেকে কঠোরতর শাস্তির বিধান রাখা হোক, যতই হারকিউলিসের আবির্ভাব ঘটুক, কিচ্ছু হবে না।

20181210_131841

আবু জাফর শিহাব(এল এল বি)