Friday April16,2021

আগামীকাল শনিবার লন্ডন থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরবেন বলে পত্রিকায় দেখলাম। খবরে দেখেছিলাম দেশে প্রধানমন্ত্রী একদিন হাসপাতালে গিয়ে মাত্র দশ টাকা দিয়ে সাধারণ জনসাধারণের মত লাইন দিয়ে টিকেট কেটে চক্ষু যুগল  ডাক্তারদের দেখিয়ে ছিলেন। আমি সেদিন এক বন্ধুকে লিখেছিলাম , যাক তাহলে আমাদের প্রধানমন্ত্রী যখন লাইন দিয়ে ডাক্তার দেখালেন , এটা একটি উদহারণ হয়ে থাকবে সবার জন্যই । আমি ব্যক্তিগতভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কিছু কিছু কাজকে ভীষণ পছন্দ করি। যেমন তিনি বেশ হাসিখুশি ভাবে কোনো অনুষ্ঠানে সবার সাথে কন্ঠ মিলিয়ে গান করেন। কিংবা সাকিবের কান টেনে দেন ইত্যাদি । তিনি প্রধানমন্ত্রী বলেই কি ওনার একেবারে গম্ভীর ভাবসাব নিয়ে থাকতে হবে ! তাই আমার কাছে এগুলো ভালো লাগে । অনেক উদহারণ দেওয়া যাবে। ইউরোপেও আমি মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যদের দেখেছি, কোনো অনুষ্ঠানে কি অমায়িক ভাবে মানুষের সাথে আলাপ আলোচনা করেন কিংবা রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাতে রুটি নিয়ে রুটি খাচ্ছেন, এই দেশের বর্তমান প্রেসিডেনটকে ভোটের এক সপ্তাহ পূর্বে একদিন লিন্জ শহরের রেলস্টেশনে ছোট্ট একটি ব্যাগ হাতে ট্রেনে উঠতে দেখেছি।  আমার বসবাসের শহর অষ্ট্রিয়ার  লিন্জ শহরে একটি ক্যাসিনো আছে। সেই ক্যাসিনোতে একবার এই প্রদেশের গভর্নর ডঃ পুরিঙার কে আমার পিছনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি, আমি হঠাত্ ঘুরে উনাকে দেখতে পাই। নিজে একটু হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। তাই বলছি, রাজনীতিবিদদের সহজ সরলতাকেই জনমানুষ বেশি পছন্দ করেন বলে আমার মনে হয়। এরকম উদহারণ পৃথিবীর বহু দেশেই আছে, আমাদের দেশের পত্রিকায় প্রায়শই এগুলো আসে। এই তো সেদিন দেখলাম কানাডার প্রধানমন্ত্রী ট্রুডো সেদিন হাটু গেরে একজন সাধারণ জনগণের সাথে কথা বলছেন, সেই সাধারণ জনগণটি একটি চেয়ারে বসে আছেন ! প্রধানমন্ত্রীর এই লাইন দিয়ে ডাক্তার দেখানো আমার কাছে ভালো লেগেছে, আমিতো মনে করি অনেকের কাছেই ভালো লেগেছে । তাই ভেবেছিলাম এখন থেকে উপর তালার কেউ চিকিৎসা  নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে, মানে জ্বর বা সর্দি হলেই যদি সিংঙ্গাপুর বা ব্যাঙ্কক রওনা দেয় , তাহলে ইচ্ছামত ঝেড়ে কাসবো বা মনে যা চায় তাই লিখে মনের রাগ মিটাবো।

তবে আবার মনে একদিন খটকা লাগলো, যেদিন পত্রিকায় দেখলাম প্রধানমন্ত্রী লন্ডন যাচ্ছেন চোখের অপারেশন করার জন্য । মাঝে আবার পত্রিকায় দেখলাম আমাদের দেশের ডাক্তাররা  সাইকোলজিক্যাল  কারণে প্রধানমন্ত্রীর চোখ অপারেশনের ঝুকি নিতে রাজি হননি! প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন অনিচ্ছা সত্যেও ব্রিটেনে চিকিৎসা  নিচ্ছেন । দেশের ডাক্তারদের এই বিষয় নিয়ে কিছু লিখবো না , কেননা এটা পেশার সাথে যায় কিনা ? সেটা কোটি টাকার প্রশ্ন । যাহোক প্রধানমন্ত্রী সুস্থ হয়ে ফিরছেন সেটাই আমাদের জন্য মঙ্গলের।

একটি দেশের প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা থাকা সত্বেও ( তাও সেটা প্রথমবারের মত আমাদের দেশে )  যখন দেশে চিকিৎসা করাতে পারেন না তখন আর কি বলা যায় । আমাদের দেশের প্রেসিডেনট থেকে শুরু করে সব বড় কর্তা বিদেশে চিকিত্সা নেন, সেটাতো সবার জানাই আছে এবং এটা নিয়ে সমালোচনাও কম নয়। অথচ আমাদের পাশের দেশের একটি উদহারণ দেই, সেই সময়ে ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী তার হাটুর অপারেশন করাবেন , তার দেশের ডাক্তাররা পরামর্শ দিয়েছিলেন বিদেশে করাবার জন্য । বাজপেয়ী তখন বলেছিলেন , “যে দেশের জনগণ এই দেশেই চিকিৎসা করায়, সেই দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে আমি কি করে বিদেশে চিকিৎসা  করাই”? সেই সময়ে পত্রিকায় দেখেছিলাম এবং পরবর্তীতে বাজপেয়ী দেশেই হাটুর অপারেশন করিয়েছিলেন। আরো একটি উদহারণ দেই এই মহাদেশেরই , ” মালয়েশিয়ার  প্রধানমন্ত্রী মহাথির মোহাম্মদ দুই বছর অপেক্ষা করে নিজের দেশের হাসপাতাল কে উন্নত করে নিজ দেশেই হার্টের    চিকিৎসা  করিয়েছিলেন। 

যাকগে, আজকে আসলে যা লিখতে চেয়েছিলাম সেই বিষয়ে আসি। আমাদের প্রধানমন্ত্রী লন্ডনে পৌঁছেই একটি বিস্ফোরণ মূলক টেলিফোন কল করেছেন। যা কিনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও। সেই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে , প্রধানমন্ত্রী গাড়িতে যাচ্ছেন এবং টেলিফোনে স্পষ্টতই বলছেন, ‘ তারেককে জানিয়ে দিও, ও যদি বেশি বাড়াবাড়ি করে তাহলে ওর মা জেল থেকে বেড় হতে পারবে না ” !  আবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী লন্ডনেই  একদিন  বক্তব্য বলছেন “দেশে সাহসী কোনো বিচারপতি নাই ” ! 

লক্ষ্যণীয় যে, একটি টেলিফোনের আলাপে যা বলছেন তাতে স্পষ্ট হয় যে বিচার ব্যবস্থায় সরকারের নিশ্চিত হাত আছে, সরাসরি বললে বলা যায় কাগজের বাঘ বিচার বিভাগ। আবার আরেকটি বক্তব্য বলছেন বিচারপতিদের সাহসের কথা ! কি আশ্চর্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি নিজেই সরকার প্রধান হয়ে দ্বিচারিতা প্রকাশ করেন , তাহলে বিষয়টি কেমন দাঁড়ায়  ? বিচারপতিরা সাহস দেখাবে কোথা থেকে, তারা তো নিশ্চয়ই সাবেক প্রধান বিচারপতি সিনহা সাহেব কে প্রায়শই স্বপ্নেও দেখেন বলে মনে হয়।

মজার ব্যাপার হলো, আমাদের দেশে বিরোধীরা কেউ টেলিফোনে একটি উচ্চবাচ্য করলেই সেই টেলিফোন কন্সপিরেসি দেশের টিভির পর্দায় ঘন ঘন দেখা যায় । সেটা নিয়ে কত রকম টক শো হয়। ওদের চৌদ্দগোষ্ঠি ধুয়ে সাফ করে দেওয়া হয়। অথচ দেশের প্রধানমন্ত্রীর এই টেলিফোন কন্সপিরেসির বিষয়টি না কোনো পত্রিকায় দেখলাম, না কোনো টিভির পর্দায়, না কোনো টক শোতে শুনলাম ( হতে পারে আমার চোখে পড়েনি)  দেশের একটি বেশ স্মার্ট টিভি চ্যানেল ( নাম দিয়েই বলি ) ৭১ যারা এই টেলিফোন কন্সপিরেসির বিষয়ে ভীষণ নাম কামিয়েছিলেন । অথচ এই টিভির পর্দায় দূরবীন দিয়েও এটি খুঁজে পাওয়া যায় নি ! কত টক শো ওয়ালারা টেলিফোন কন্সপিরেসি নিয়ে  কত চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলতেন, তারা কত খারাপ? কত দেশ বিরোধী? ইত্যাদি ইত্যাদি বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলতেন ! এবার তাদের টিভির পর্দায় দেখেছি কিন্তু মুখে এই টেলিফোন কন্সপিরেসি বিষয়ে একটি টুশব্দটিও শুনেনি ! সাংবাদিকদের পত্রিকার পাতায় হাজার হাজার শব্দ লিখতে দেখেছি! এবার তাদের কলমের কালি একেবারেই শুকিয়ে ছিলো। বিটিভির কথা না হয় বাদই দিলাম। কেননা বিটিভির বিষয় এটি নিশ্চয়ই নয়। কেননা বিটিভি আছে দেশের ক্রান্তিকালেও সবজি চাষ নিয়ে বা কিভাবে ভালো এবং সহজ উপায়ে পরাটা বানানো যায় তা নিয়ে । 

লেখার শেষে বলি, উপরের উল্লিখিত সকল বিষয় যদি সত্যি সত্যি বিবেচনায় নেওয়া হয় তাহলেও দেশে যে আরো বেশি বিপদ নেমে আসবে। কেননা যদি পেশার প্রতি সামান্য একটুও সম্মান থাকে বা ব্যক্তিগত লাজ লজ্জা থাকে তাহলে যে সবাইকেই (ডাক্তার/ সাংবাদিক ) পেশা ত্যাগ করা উচিত। এমনকি প্রধানমন্ত্রীরও। কি আর বলা যায়, চলিতেছে সার্কাস, জনগণ আছে এখন এবাদত নিয়ে, সুতরাং চলুক। নিশ্চয়ই যা হবার সব ঈদের পরে হবে।

20190210_195317

বুলবুল তালুকদার

সহকারী সম্পাদক ,শুদ্ধস্বর ডটকম