Tuesday April20,2021

১ মে ১৮৮৬ সাল   ইউনাইটেড স্টেটের শ্রমিকরা ১২ ঘন্টার পরিবর্তে ৮ ঘন্টা কাজের প্রবর্তনের জন্য শিকাগোতে “Haymarket-Square” এ ধর্মঘট শুরু করে । হঠাত্ই ধর্মঘট চলাকালিন একটি বোমা নিক্ষেপ হয় এবং অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটে । এই ধর্মঘটের আটটি আয়োজক সংগঠনের বিরুদ্ধে একটি বিতর্কিত বিচারের মাধ্যমে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং চারজনের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয় ।

এই দিনে জাতীয় ১১ হাজার কম্পানির প্রায় ৪০০,০০০ কর্মচারী এই ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করে। আজ অব্দি ১ মে কে যুক্তরাষ্ট্রে ঐতিহ্যগতভাবে ” চলন্ত দিন ” হিসেবে বিবেচিত হয় । সমগ্র পৃথিবীতেই এটি শ্রমিক দিবস হিসেবে বিবেচিত এবং একটি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়।  ( সংক্ষেপে)

৭০ দশকে হেনরি কিসিঞ্জারের  সেই বাণী “বোটমলেস বাস্কেট” এখন যে মোটামুটি ভরা তা তো তাদের দেশেরই কত বিখ্যাত ব্যাক্তিগণ সাম্প্রতিককালে উচ্চারণ করেছেন । স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর আমাদের যে উন্নত হয়েছে এতে কোনো সন্দেহ প্রকাশ করার সুযোগ নাই। আরো বেশি উন্নয়নের সুযোগ ছিলো কিনা ? সেটা নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে । তবে সবচাইতে বড়ো আকাড়ের বিতর্ক হওয়া উচিত , যে মেহনতি মানুষের কল্যানে এই পর্যন্ত দেশ আসতে পেরেছে , এই উন্নতির অবয়বে আসতে পেরেছে, তাদের নিয়ে ।

একটা দেশের সরকার সবকিছুর ব্যাবস্থা করে দিতে পারে না । প্রতিটি দেশের জনগণের নিজের এবং সাথে সরকারের কার্যকরী উদ্দেগেই সমষ্টিগতভাবে দেশ এগিয়ে যায়। আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও তার তারতম্য ঘটেছে , বলা যাবে না । তবে শত প্রশ্ন করা যেতেই পারে , কিন্তু, ?কেন ? এবং  ইত্যাদি ইত্যাদি । এখানে উল্লেখ করা দরকার যে , পুঁজিবাদী সমাজের মুক্তবাজার অর্থনীতি একটা চলমান প্রক্রিয়া । যতটুকুন মনে পরে , একসময়ের দেশের দীর্ঘদিনের  অর্থমন্ত্রী প্রয়াত সাইফুর রহমান সাহেব সর্বপ্রথম আমাদের দেশে মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু করেন  এবং আজ অব্দি সকল সরকার তা বহাল রেখেছেন। বলা বাহুল্য যে , মুক্তবাজার অর্থনীতিতে প্রতিটি  সরকারকে বাজারে একপ্রকার সমানতালে প্রতিযোগিতায় থাকতে হয়।  কেননা মুক্তবাজার অর্থনীতিতে যেমন সুফলতা আছে আবার পুঁজিবাদের অপপ্রয়াসে কুফলতার পরিমানটাও  সমান বড়ো। প্রশ্ন থাকতেই পারে আমাদের দেশের সরকার গুলো মুক্তবাজার অর্থনীতিতে কতটুকুন কার্যকর ভুমিকা রাখতে পেরেছে । টিসিবির কার্যক্রম একটি উদহারণ বলা যায় ।

বাজার অর্থনীতি বলা আমার কাজ নয় । মূলত এই মুক্তবাজার অর্থনীতিতে আমাদের সামগ্রিক মেহনতি মানুষেরা কি অবস্থায় আছে , তাই এই মহান মে দিবসে পর্যালোচনার বিষয় । আমি কোনো খাতার সুচকে যাবো না । সার্বিকভাবে সমাজের মেহনতি মানুষের অবস্থান কি ? তার  উদহারণ দেখার চেষ্টা করবো । একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, আমাদের দেশের কৃষক ,শ্রমিক , মেহনতি মানুষেরাই অর্থনীতির চালিকা শক্তি অথচ এই মানুষেরাই সবচাইতে জীর্নশীর্ন । একজন শ্রমিকের দৈহিক কস্টের কথা বাদ দিয়েও , দৈনন্দিন চলার অবস্থা লক্ষ্য করলে দেখা যায়  ।

যদি নিম্ন হিসেবও করি , তাহলেও সকাল , দুপুর এবং রাত মিলিয়ে একজন শ্রমিকের খাদ্যের জন্য বর্তমান বাজার দরে কমপক্ষে ৮০ টাকা লাগে দৈনন্দিন । ঘর ভাড়া বস্তি পর্যায়েও পানি বিদ্যুত সহ নিম্নে ৪,০০০ হাজার টাকা লাগে নিশ্চয়ই । পরিবার প্রতি আমাদের জনসংখ্যা অনুসারে নিম্নে গড়ে ফ্যামিলিতে ৩ জন করে , গৃহকর্ত্রী সহ ৪ জনের খাওয়া খরচ দৈনন্দিন গড়ে ১০০ টাকা ধরলে ( যদিও হাস্যকর) বেশি বাড়াবাড়ি নিশ্চয়ই হয় না । আর পরিবারের সকলের কাপড় , ঔষধ এবং আনুষঙ্গিক খরচ যদি সর্বপরি ২০০০ টাকাও হয় , তাহলে একজন শ্রমিকের মাসে নিম্নে প্রায় গড়পড়তায় ১৩ /১৪ হাজার টাকার প্রয়োজন হয় নিশ্চিত ।

>  উদহারণ স্বরুপ গারর্মেন্ট শ্রমিকদের সরকার কর্তৃক নির্ধারিত নিম্ন বেতন (সম্ভবত ৮ ,৩০০ টাকা মাত্র ) দিয়ে একজন শ্রমিক কি করে চলতে পারে ?

>  যেখানে শিকাগোতে ১২ ঘন্টার জায়গায় ৮ ঘন্টা কাজের দাবীতে আজকের এই মে দিবস। সেখানে আমাদের শ্রমিকদের নিম্নে ১৬ ঘন্টা কাজ করতে হয়।

>  যদিও প্রশ্ন থেকে যায় , মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বেতন কেন সরকার কে বেঁধে দিতে হবে ? উওরে বলা যায়, পুঁজিবাদী সমাজ একান্তই শোষণের চরিত্র বহন করে । আর আমাদের মতন উঠতি দেশের পুঁজিবাদের

চরিত্রটি একটু বেশিই শোষন মূলক হয়। সেই ক্ষেত্রে বলা বাহুল্য যে , আমাদের এই সরকার বেতন ভাতা নির্ধারণ করে , নিদেন পক্ষে শ্রমিকদের স্বপক্ষেই অবস্থান গ্রহণ করেছে ।

লক্ষ্যণীয় যে একান্তই প্রাইভেট কাজের ক্ষেত্রগুলো যেমন গাড়ির ড্রাইভার , ঘরের কাজের  বুয়া কিংবা একজন দারোয়ান , এদের কর্মক্ষেত্রে কোনো নিয়ম নীতির বালাই নাই । নির্দিষ্ট কোনো বেতন কাঠামোও নেই এবং কাজের সময়, সেই প্রশ্নতো অবান্তর ।

>  মে দিবস উপলক্ষে , টিভির পর্দায় কত বড়ো বড়ো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, শ্রমিক নেতা, কর্পোরেটের ব্যক্তিবর্গ শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কত কথা বলেন !

>  একবার ওনাদের জিজ্ঞাসা করলে জানা যেতো , ওনাদের নিকট কর্মরত শ্রমিকদের কি অবস্থা? কতটুকুন অধিকার ওনারা দিচ্ছেন ?

বাংলার কৃষকের কথা না বললেই নয় । যাদের ঘামের ফলে আমাদের ১৮ কোটি মানুষের পেট চলে , তাদের শরীরের দিকে একবার ভালো করে লক্ষ্য করলে বুঝা যায়  তাদের স্বাস্থ্যগত অবস্থান কি?  সার্বিকভাবে আমাদের সকল শ্রমিক শ্রেণীর দৈহিক অবস্থা প্রায় একই রকম  ।

>  দেশে নানান সূচকের উর্ধগতির কথা শোনা যায় । কেউ কি ভালো করে ভেবে দেখেছেন  , তাহলে আমাদের শ্রমিকদের কেন পুষ্টি হীনতায় এই জীর্নসির্ন অবস্থা  ?

সর্বশেষে বলতে হয় শ্রমিক সংগঠনের কথা ।  শ্রমিক সংগঠন গুলোকে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো বরাবরই ব্যবহার করে এসেছে , নিজেদের রাজনৈতিক ফয়দা লুটবার জন্য । শ্রমিক সংগঠন গুলো যতদিন এই রাজনৈতিকদল গুলোর লেজুরবীত্তি থেকে বের হয়ে আসতে না পারবে , ততদিন শ্রমিকদের ভোগান্তি নিশ্চিত বহাল থাকবে ।

আজকের এই মহান মে দিবসে বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর  সকল শ্রমিকদের প্রতি আমার ব্যক্তিগত এবং শুদ্ধস্বর পত্রিকার পক্ষ থেকে লাল সালাম। জয় হোক সমগ্র  শ্রমিকের ।

20181221_172132

বুলবুল তালুকদার

সহকারী সম্পাদক ,শুদ্ধস্বর ডটকম