Friday April16,2021

ইতিহাস নির্ভর উপন্যাসে লেখকের স্বাধীনতা যেমন পুরোপুরি থাকে না,তেমনি তাঁকে সর্বদা সচেতন থাকতে হয় যাতে ইতিহাসের কোনো বিকৃতি না ঘটে।বিশ্বসাহিত্যে স্যার ওয়াল্টার স্কটের ‘আইভানহো’ কিংবা আমাদের বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে এ ধরণের বিকৃতি নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে।

ইতিহাস,লোককথা এবং মিথ নিয়ে বাংলাদেশে সফল উপন্যাস খুব কমই লেখা হয়েছে।এক্ষেত্রে ‘হীরকডানা’ ও ‘মায়ামুকুট’ উপন্যাসে বিশেষ পারদর্শিতার প্রমাণ রেখেছেন তরুণ কথাসাহিত্যিক স্বকৃত নোমান।

ভাটির বাঘ বলে পরিচিত শমসের গাজী ছিলেন নবাব সিরাজউদ্দৌল্লার পর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে অন্যতম প্রধান বিপ্লবী।তার জীবন নিয়ে প্রচলিত  আছে অসংখ্য লোককথা,মিথ।অন্যদিকে ইংরেজরা তাকে দস্যু-তস্কর আখ্যা দিয়ে তার বীরত্বকে কলঙ্কিত করতে চেয়েছে।সেই শমসের গাজীকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন স্বকৃত নোমান।বিদ্যাপ্রকাশের প্রকাশিত বইটি এইচএসবিসি-কালি ও কলম,ব্রাক ব্যাংক-সমকাল,এক্সিম ব্যাংক-অন্যদিন সাহিত্য পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছে।

বিরুদ্ধ প্রকৃতি ও প্রতিকুল সময়ের বর্ণনা দিয়ে লেখক উপন্যাস নির্মাণ শুরু করেন।যেন এক ধ্বংসাত্মক অলৌকিক শক্তি গল্পে বর্ণিত জনপদের মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

‘কিন্তু এখন দখিনা বাতাসে ভর করে রঘুনন্দনগিরি থেকে যার মোহনবাঁশির সুরলহরী ভেসে আসছে সে উল্কাপিণ্ড নয়,মানুষের ঔরসে জন্ম নেওয়া মানুষ!নাহ,দক্ষিণশিকের মানুষেরা ঠিক বিশ্বাস করতে পারেনা,বাঁশিওয়ালা যদি মানুষই হয়,তবে কেমন করে সে রঘুনন্দনগিরির গহিন জঙ্গলে জলজ্যান্ত একটা বাঘের সঙ্গে লড়াই করে জিতে গেল?আচ্ছা,তা না হয় মানা যায়।কিন্তু বিষধর শঙখচূড়  কি কখনো ঘুমন্ত মানুষের মাথার উপর ফণা তুলে ছায়া দেয়?’

কি অসাধারণ দক্ষতায় লেখক গল্পে প্রোটাগনিস্টের প্রবেশ ঘটালেন!প্রথমেই জানান দিলেন নায়ক একইসাথে  একজন বংশীবাদক ও বীর।বাঙালি চিরকালই বীরপূজা করে গেছে।তাই বীরকে নিয়ে তৈরি হয়েছে মিথ।শমসের গাজীকে নিয়ে যে অসংখ্য মিথ প্রচলিত তা বাঙালির এই স্বভাবেরই অংশ,একইসঙ্গে এই মিথ জানান দেয় শমসের কতটা দুঃসাহসী ছিলেন।

এরপর কাহিনী তরতরিয়ে এগিয়ে যায়।মগ-পর্তুগিজ জলদস্যুদের বিরুদ্ধে লাঠিয়াল বাহিনী গড়ে উপকুলীয় জনপদ থেকে তাদের বিতাড়িত  করেন শমসের গাজী।কবি সৈয়দ গদা হোসেন তার অন্তরে জ্বালিয়ে দেন জ্ঞানপ্রদীপ। জমিদারকন্যা দরিয়ার সঙ্গে অসফল প্রেম তার জীবনকে উন্নীত করে ভিন্ন মাত্রায়।কৃষক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে অধিকার করে নেন জমিদারি।

কৃষকদের সাথে নিয়ে দখল করেন ত্রিপুরার রাজত্ব। সিরাজউদৌল্লার মৃত্যুর পর ইংরেজদের সাথে যুদ্ধ বাধে শমসেরের।

শমসের জমিদারি পেলেও উঠে এসেছেন মূলত কৃষক পরিবার থেকেই।তাই শ্রেণি সচেতনতা তার মধ্যে প্রবলভাবে ছিল।মগ-পর্তুগিজ দস্যু ও তাদের সহযোগীদের কাছ থেকে ধন সম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে দরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন এই বিপ্লবী।কৃষক বিদ্রোহের মাধ্যমে জমিদারি প্রাপ্তির পর কৃষকদের এক বছরের কর মওকুফ করেছিলেন।প্রজাবিদ্বেষী কাজে বাধা দেওয়ায় ত্রিপুরার রাজনের সাথে তার যুদ্ধ বাধে।একই কারণে পরবর্তীতে শ্রমজীবী জনতার অধিকার রক্ষায় লড়াইয়ে নামেন ইংরেজ লুটেরাদের বিরুদ্ধেও।শমসের গাজীর বিদ্রোহ যেন ফসলের অধিকার রক্ষায় মেহনতি মানুষের চিরন্তন সংগ্রামের এক প্রতিচ্ছবি।

হীরকডানা উপন্যাসের প্রধাণ চরিত্র শমসের গাজী।তার প্রভাবে অন্যান্য চরিত্র তেমন উজ্জ্বল না হয়ে উঠলেও সেনাপতি বন্ধু সাদু এবং লেখকের সৃষ্টি মনোহর বেশ গুরুত্ব বহন করেছে।সামন্তপ্রভু নসিরমন চৌধুরী,ত্রিপুরার রাজা কিংবা ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী প্রত্যেকেই শ্রেণি স্বার্থ রক্ষায় সচেষ্ট।

আঙ্গিক বিবেচনায় উপন্যাসটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবীদার।লেখক যে বিষয়টিতে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন তা হল ভাষা।সাবলীল ভাষায় রূপক ও উপমার অলঙ্কারে তৎকালীন পরিবেশ,মানুষের জীবনযাত্রা,উপার্জনের মাধ্যম,ভাটি অঞ্চলের ভৌগোলিক প্রকৃতি সবকিছুই ফুটিয়ে তুলেছেন।

ঐতিহাসিক বিকৃতি এড়িয়ে মিথ ও লোককথাকে সন্দেহের প্রশ্ন থেকে দূরে রাখার এক দারুণ কৌশল অবলম্বন করেছেন স্বকৃত নোমান।মায়ামুকুট এবং হীরকডানা উভয় উপন্যাসেই একজন পুঁথি লেখক আছেন যারা উপন্যাসের প্রধাণ চরিত্রের সাথে বেশ ঘনিষ্ঠ। এই পুঁথিলেখকদের রচনায় যখন মুলুকচান কিংবা শমসের গাজীকে নিয়ে মিথগুলো ভেসে ওঠে,তখন পাঠককে আর তা নিয়ে লেখকের কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার দরকার পড়ে না।

ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত বর্তমান ফেনীর বীর শমসের গাজীকে নিয়ে স্বকৃত নোমান লিখেছেন হীরকডানা।উল্লেখ্য,লেখকের নিজের জন্মস্থানও ফেনী।নিজ অঞ্চলের ইতিহাস,সংস্কৃতির গৌরব টিকিয়ে রাখার যে দায় লেখকের উপর বর্তায়,স্বকৃত নোমান সেটাই পূরণ করতে চেয়েছেন।একইসঙ্গে মাতৃভূমির এই স্বাধীনতাকামী বীরের গায়ে ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী যে কলঙ্ক লেপে দিয়েছিল,তা মুছে দেওয়ার ঐতিহাসিক দায়িত্বও সফলতার সাথে পালন করেছেন।

51376299_2119853051411621_23291500272025600_n

লেখক:উলুল আমর(অন্তর)