Sunday April11,2021

প্রথম পর্ব

কয়েক’শ বছর আগের কথা। ইব্রাহিম লোদীকে তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধে পরাজিত করে জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর তখন দিল্লির তখতে বসেছে। সেই সময় ভারতবর্ষের উত্তরপূর্ব কোনঘেষা পাশাপাশি দুটি ছোট ছোট রাজ্য ছিল। সূর্যনগর ও ধর্মপুর। মহারাজ সুরজিৎ সেন ছিলেন সূর্যনগরের রাজা। আর ধর্মপুরের রাজা ছিলেন আফজল খাঁন। রাজ্যগুলো ছোট ছোট হলেও খুব সমৃদ্ধ ছিল। শক্তিতে,সম্পদে কিংবা শিক্ষায় দুই রাজ্যই ছিল অতুলনীয়। প্রজারা শান্তিতে বাস করত। দুই রাজার মিত্রতার বন্ধন ছিল দেখার মতো! সুখে শান্তিতেই কাটছিল সূর্যনগর আর ধর্মপুরের প্রজাদের জীবন। হঠাৎ ঘটে যায় এক অঘটন। ভেঙে যায় দুই রাজ্যের প্রীতি ও বন্ধন। রাজা সুরজিৎ সেনের সুন্দরী এক সুন্দরী বোন ছিল। আর মহারাজ আফজল খাঁনের ছিল এক ছোট ভাই। আর এই দুজনের মধ্য ভালবাসার সম্পর্ক ছিল। সুরজিৎ সেন তার বোনের বিবাহ ঠিক করেছিল অন্য এক রাজকুমারের সঙে। আর ভালবাসার মানুষকে কাছে না পাওয়ার জন্য সুরজিৎ সেনের বোন আত্মহত্যা করেছিল। এদিকে তৈমুর খাঁনের ভাই ও করেছিল আত্মহত্যা। ব্যাপারটা জানাজানি হওয়ার পর দুই রাজাই একে অপরকে দোষারোপ করতে থাকে। সুরজিৎ সেন আর আফজল খাঁন হয়ে যায় একে অপরের জাত শত্রু। যুদ্ধ লাগে দুই রাজ্যের ভেতর। দীর্ঘ একুশ বছর ধরে চলে সেই যুদ্ধ। বিশেষ করে যে রাতে ওরা মারা গেছিল প্রতিবছর সেই রাতে জীবন দিতে হয় দুই রাজপরিবারের কাউকে না কাউকে। শুরু হয় মহা কালরাত্রি। দুই রাজ্যেই নেমে আসে মৃত্যুর বিভীষিকা।

এই যুদ্ধ আর ধ্বংসের  মাঝেই জন্ম হয়  নতুনের। একরাতে সুরজিৎ সেনের রাণী জন্ম দেয় এক পুত্র সন্তানের। সুরজিৎ তার নাম রাখেন রুদ্র সেন। কালচক্রে মনে হয় তখন বড় ধরনের পরিবর্তন অবসম্ভাবী ছিল। সেই কারণেই নিয়তি খেলেন অভুতপূর্ব এক খেলা। একই রাতে আফজল খাঁনের হেরেমে বেগম সুলতানাও জন্ম দেন এক কন্যা সন্তানের। যিনি পরবর্তীতে শাহজাদী শাফিকা খাঁন নামে পরিচিত হোন।

রাত তখন দ্বিপ্রহর। সমগ্র সূর্যনগর তখন ঘুমিয়ে আছে। রাজপ্রাসাদের অলিন্দে দাড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন মহারাজ সুরজিৎ সেন। চাঁদটা ততক্ষনে পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছি অনেকখানি। চাঁদের তীব্র আলোয় অপার্থিব মনে হচ্ছিল সব কিছু। মনে পড়ছিল বোন আশালতার কথা। সেই ছোট্টবেলা থেকে দাদা ঘেষা ছিল সে। সবসময় আশে পাশেই থাকত। বোনের মৃত্যুমুখটা আরেকবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সুরজিৎ সেন শপথ করে ধর্মপুরকে একদিন শশ্মানে পরিণত করবেন। আর এজন্য রুদ্রকে তৈরী করবেন নিজ হাতে। রুদ্র। তার পুত্র রাজকুমার রুদ্র।

এদিকে ধর্মপুরের রাজপ্রাসাদেও তখন খুশির বন্যা বয়ে যাচ্ছে। কারণ গত পাঁচশত বছরে ধর্মপুরের রাজপরিবারের কোন কন্যা সন্তানের জন্ম হয়নি। আফজল খাঁন যখন কন্যাকে কোলে নিয়ে তার বংশের নিয়ম অনুযায়ী তার হাতে সোনার আংটি পড়াচ্ছিলেন তখন কন্যা হাতটি সরিয়ে নিয়ে আফজল খাঁনের কোমরে রাখা তরবারীতে হাত দেয়। আফজল খাঁন সহ ওখানে থাকা সবাই অবাক হয়ে যায়।

আফজল খাঁন বেগমের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘একদিন আমার এই কন্যা সমগ্র ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠা পাবে তার বীরত্বের জন্য। শাহজাদী শাফিকা খাঁন নামে বিখ্যাত হবে সে।

এমনি করে কেটে গেল অনেক মাস। সূর্যনগর আর ধর্মপুরের যুদ্ধ তখনও চলছে। যুদ্ধ বলতে ময়দানি যুদ্ধ নয়। যে যখন যেভাবে পারছে এক রাজ্য আরেক রাজ্যের ক্ষতি করছে। একদিন সূর্যনগরের মহারাজ আর মহারানী মহলের উদ্যানে বসে গল্প করছিলেন। আর রাজকুমার রুদ্র খেলা করছিলেন। ছেলের দিকে তাকিয়ে মহারাজ সুরজিৎ সেন বললেন,’মহারাণী, ভগবান শিবের আরেক নাম রুদ্র। যখন দেবাদিদেব ক্রদ্ধ হন তখন সংসারে প্রলয় আসে। তাইতো নটরাজকে রুদ্র বলে সম্বোধন করা হয়। ভগবান শিবের রুদ্র রুপকে প্রতিরোধ কেবল মাত্র জগজ্জননী মাতা পার্বতীই করতে পারতেন। আমাদের রুদ্রও ভগবান শীবের ন্যায় মহান আর শক্তিমান হবেন।

’জয় ভগবান শীবের জয়। তাই যেন হয়। মহারাণী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, কিন্তু এবার তো কুমারের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। অস্ত্র ও শাস্ত্র বিদ্যায় কুমারকে অদ্বিতীয় করে তুলতে পারে এমন গুরু কে আছে ভারতবর্ষে?

’আমাকে একটু ভাবতে দাও মহারাণী। আমি কুমারের জন্য ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ গুরু নিয়ে আসব।

এদিকে ধর্মপুরের মহারাজ আফজল খাঁনও খুব চিন্তিত শাহজাদী শাফিকার শিক্ষার ব্যাপারে। তিনিও ভাবছিলেন কে হতে পারেন শাহজাদীর গুরু। যার কাছে শিক্ষালাভ করে শাহজাদী ভারতবর্ষে অদ্বিতীয়া যোদ্ধা হিসেবে খ্যাতি লাভ করতে পারে?
রাজকুমার আর শাহজাদীর গুরু অন্বেষনের জন্য দুই রাজ্যেই ঢাক পেটানো হয়। সমগ্র ভারতবর্ষে দুত পাঠানো হয় যোগ্য শিক্ষক খুঁজে আনার জন্য।

49183524_221208595465542_5255786252170428416_n

জাকওয়ান হুসাইন