Wednesday April14,2021

২৪/০৩/৮২  সালের কালো অধ্যায়ের দিনটি গতকাল পাড় হয়ে গেলো, চলে এলো সেই বিভীষিকা ময় ভয়াল ২৫/০৩/৭১ এর কালরাত, জাতীয় গণহত্যা দিবস । ৭১ এই রাতে মধ্যরাতে বর্বর পাকি হানাদার বাহিনী অত্যাধুনিক অস্রে সজ্জিত হয়ে কাপুরুষের মত তাদের পূর্ব পরিকল্পিত অপারেশন সার্চলাইটের নীলনকশা অনুযায়ী আন্দোলনরত বাঙালিদের কন্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার ঘৃণ্য লক্ষ্যে  রাজধানী ঢাকাসহ সাড়াদেশে নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।  ২৫ মার্চের গণহত্যা শুধুমাত্র এক রাতের হত্যাকাণ্ডই ছিলো না, এটা ছিলো মূলত: বিশ্ব সভ্যতার জন্যেও এক কলঙ্কজনক জঘন্যতম অপরাধ ও গণহত্যার সূচনা মাত্র । এই বর্বর পাকি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালিরা দীর্ঘ সাড়ে নয়মাসের একটি জনযুদ্ধের মাধ্যমে এ বাংলার মাটিকে মুক্ত করে পৃথিবীর বুকে লাল সবুজ পতাকার একটি স্বাধীন দেশ রচিত করে। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে তিরিশ লক্ষ শহীদ আর দুলক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অসাম্প্রদায়িক, মানবিক, সাম্যে ও সর্বোপরি গণতন্ত্রের ভিত্তিতেই এই স্বাধীন বাংলাদেশ ।

যে স্তম্ভের উপর ভিত্তি করেই এই বাংলাদেশ, তার জন্ম থেকেই স্তম্ভগুলোকে নানান দিক থেকেই দূর্বল করার প্রচেষ্টা ছিলো।  বলা যায় যাদের এই প্রচেষ্টা তারা যেন অনেকটাই সফল। অনেক ইতিহাসের একটি ইতিহাস সেই ২৪ /০৩/৮২ দিনটি। ৮২ সালের ২৫ সে মার্চের কালদিনের একদিন পূর্বেই ২৪ সে মার্চে, বিসমিল্লাহে রহমানের রাহিম, প্রিয় দেশবাসী বলে,  দেশের এই ক্রান্তীকালে (!) দেশকে জনগণের স্বার্থে রক্ষার জন্য , জনগণের বিশ্বাসের স্থান প্রাণ প্রিয় সেনাবাহিনী দেশের ক্ষমতা হাতে তুলে নিতে বাধ্য হলো ” ! আশ্চর্যের বিষয় হলো তখনও দেশে একজন নির্বাচিত প্রেসিডেনট সাত্তার সাহেব ক্ষমতার চেয়ারে বসে আছেন। কিন্তু না, দূধে আলতার মত স্পষ্ট রঙের আমাদের সেনাবাহিনী দেশে ক্রান্তিকাল দেখলেন! সুতরাং সেই বর্বর পাকি সেনাবাহিনীর মত ক্ষমতার চর্চায় নিয়োজিত হয়। এরশাদের মত একজন পাকিস্তান ফেরত সুদর্শন সেনা অফিসার সেই চর্চা বেশ শক্তিশালী ভাবেই সাড়ে নয় বছর পাড় করে দেয়। বিপরীতে দেশের শত শত তরুণ ছাত্র/ছাত্রী , রাজনীতিবিদদের অক্ষত না রেখে, ট্রাকের চাপা আর বন্দুকের গোলায় হত্যা ।

সদ্য এই স্বাধীন দেশে গণতন্ত্র হত্যার নানান ইতিহাস পূর্ব থেকে বর্তমান পর্যন্ত প্রচুর এবং শুধুমাত্র স্বৈরাচার সরকারই নয়, এর সাথে আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর অবদানও কম যায় না ! তবে আমার আজকের আলোচ্য বিষয় স্পষ্টতই এরশাদের অনৈতিক ক্ষমতা গ্রহণ । জিয়া হত্যা কাহিনীর পরেই এই তথাকথিত পাকিস্তান ফেরত জেনারেল ক্ষমতা গ্রহণের জন্য বেশ তোড়জোড় শুরু করলেন।  অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের লেখা থেকেই স্পষ্ট জানা যায়, সেই সময়ে এই এরশাদ স্বয়ং নিজে চলতি পার্লামেন্টে প্রায়শই এসে হাজির হতেন। চলতি পার্লামেন্ট কে অবাক করে এবং অধিবেশন থামিয়ে দিয়ে এই জেনারেল তার উচ্চমার্গের মিলিটারি ইংরেজি ও বাংলায় সরাসরি রাজনীতিবিদদের গালমন্দ শোনাতেন। এই জেনারেলের নাকি ইউ বাস্ট্রার্ড বেশ জনপ্রিয় গাল ছিলো। তিনি পার্লামেন্টের স্পিকার থেকে শুরু করে কাউকেই নাকি গালমন্দ করতে বাদ দিতেন না! সকলের মাঝে বন্দুকের ভয় ভিত্তি তৈরি করে, এই সেই ২৪ সে মার্চ ৮২ তে সত্যি সত্যি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন !

কথায় বলে ” বাঘের পিঠে চড়ে হয়তো বেড়ানো যায়, তবে নামাটা অত সহজ নয়” । যে স্বাধীন দেশের ভিত্তি  মূলেই গণতন্ত্র ছিলো প্রথম শর্ত,  সেই গণতন্ত্রকে বৃদ্ধা অঙুলি দেখিয়ে নানান ছলাকলায় দীর্ঘ সাড়ে নয় বছর ক্ষমতায় । ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তার এই দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের জন্য আবার সেই গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর অবদানও কম নয়। তবে মজার বিষয় হলো, সেই সকল রাজনৈতিক দল বা জোট যে ভাবেই এরশাদের খপ্পরে চলেছিলো, যেমন ভোটে অংশগ্রহণ করে বা অন্য কায়দায়  বা রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার জন্য। তারাই আবার জনসমক্ষে এখন বড় গলায় বলেন, ” সেদিন আমরা এটা বা সেটা করে, গণতন্ত্রকে রক্ষার করেছিলাম” !!!  দুঃখজনক হলো আমাদের তথাকথিত গণতান্ত্রিক  রাজনৈতিক দলগুলো কখনোই সত্য স্বীকার করে না।  তবে, শেষ ভালো সব ভালো, সেই সূত্রে বলা যায়, বলিষ্ঠ ছাত্র সমাজ কখনোই মাথা নত না করে এবং অতঃপর সেই রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তিশালী আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই এই কুখ্যাত পাকিস্তান ফেরত জেনারেলের পতন ঘটায়। এক অর্থে বলা যায়, সেদিন গণতন্ত্রের সত্যি উদ্ধার হয়েছিলো। পরবর্তীতে চর্চা হয়েছিলো বা হচ্ছে কিনা ? সেটা নিজেদের বিবেকেই বিচার বিশ্লষণ করলেই আশা মত ফলাফল পরিস্ফুটিত হবে।

এতো গেলো এরশাদের গণতন্ত্র হত্যার অল্প কাহিনী বা ছোট্ট করে বলা। এই পাকিস্তান ফেরত জেনারেল যুদ্ধ জয়ী স্বাধীন দেশের মূল স্তম্ভ গুলোর আরো একটি স্তম্ভ নিজের রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে একেবারে সংবিধানে গলাই টিপে ধরেছিলো, যা কিনা আজ অব্দি বহাল তবিয়তে আছে ! আর সেটা হলো, ” সংবিধানে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম ” বসিয়ে দিয়ে । অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক করার চুড়ান্ত বীজ বপন করে গিয়ছে। মনে থাকা ভালো, এই দেশের জন্য সকল ধর্মের মানুষ রক্ত দিয়েছিলো। রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম এরশাদের পূর্বে কখনোই ছিলো না। বেশিরভাগ মানুষ মুসলিম এই সূত্রে সংবিধানে রাষ্ট্র ধর্ম বসিয়ে অন্য ধর্মাবলম্বীদের ছোটো বা খাটো করার অধিকার কেউ রাখে না। অথচ এই জেনারেল এই কাজটি করে দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার প্রথম বীজ বপন করেছিলেন। যা কিনা পর্যায় ক্রমে ধীরে ধীরে বড় হওয়ার দিকেই অগ্রসর হচ্ছে। যা কিনা স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে কোনো ভাবেই যায় না।

স্বৈরাচারী ক্ষমতার সাড়ে নয় বছরের এই পাকিস্তান ফেরত জেনারেলের ইতিহাসের কমতি নেই। সেগুলো লিখতে মহাভারত লিখতে হয়। তবে আজকে এই জেনারেলের পরিণতির অল্পকিছু বলেই শেষ টানবো। লক্ষ্যণীয়: এই সাবেক জেনারেল  গত সপ্তাহেই নিজের মুখেই বলেছে, ” তার মত অভাগা আর কেউ নাই “। হ্যাঁ অভাগাতো বটেই। তবে এটা অভাগা না কর্মের ফল ? সেটাই বড় প্রশ্ন । জনমানুষের উপর বন্দুকের নলের জোরে স্বৈরাচারী চালিয়ে এখন নিজেই ভিন্নভাবে স্বৈরাচারের স্বীকার! আখেরাত, পরকাল বাদ দিয়ে এটা বলাই যায় বা সত্যি প্রমাণিত হয়, ” কর্মের ফল এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে ফলে  ” ।

আজকের ২৫ সে মার্চের বিভীষিকাময় কালরাতে ,দেশ স্বাধীনতার জন্য সকল শহীদদের আত্মার শান্তি কামনা করি । আরো প্রার্থনা থাকবে ভবিষ্যতে যেন কোনো জেনারেলরা বিসমিল্লাহের রহমানের রাহিম বলে ২৪ সে মার্চের মত ক্ষমতা আরোহণ করে আমাদেরকে আর শাসন করতে না পারে। স্বাধীন দেশ যে স্তম্ভ গুলোকে সামনে রেখে জয়ী হয়েছিলো, ভবিষ্যতে তার পুনরাবৃত্তি হোক এবং বাংলাদেশ সুখি সমৃদ্ধশীল হোক।

20190210_195317

বুলবুল তালুকদার

সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম