Sunday April11,2021

শান্তিনিকেতনের শ্যামবাটি খালের পেছনে ফুলডাঙায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়ি ‘একা এবং কয়েকজন’ এখন বড় একা। রুক্ষ লালমাটিতে কেবলি স্মৃতির দীর্ঘশ্বাস। বাড়ির উল্টো দিকেই অর্ঘ্য সেনের খোঁয়াড়। কালো বাড়ি বলে পরিচিত। ফুলডাঙায় এক দোকানীকে জিজ্ঞেস করতেই পথ দেখিয়ে দিল ‘একা এবং কয়েকজন’ যাবার। আরো কয়েকবার শান্তিনিকেতনে এলেও প্রিয় লেখক সুনীলের বাড়ি দেখা হয়নি। এবারে না দেখে কলকাতা ফিরে যাব না এমনটি বলে রেখেছিল সুনীল ভক্ত আমার সহধর্মিণী।

55506873_10218526069052650_8489654789334892544_n.jpg

আদি বাসভূমি কালিকিনি, মাদারীপুর, ফরিদপুর ছেড়ে মাত্র চার বছর বয়সে কলকাতায় চলে আসেন সুনীল আর তার পরিবার। নিজেকে কলকাতার ‘রিফিউজি’ বলতে ভালোবাসতেন। রিফিউজি সুনীল বাড়ি করলেন শান্তিনিকেতন লাগোয়া ফুলডাঙায়। ২১ কাঠা জমির একপাশে ফুলের বাগান, পুকুর। গরু, হাঁসও আছে। লাগিয়েছিলেন আম, সফেদা, বেল, লিচু, নারিকেল, কামরাঙা, বাতাবি লেবু, আতা, তেজপাতা আর দারুচিনি গাছ। সেসব গাছ এখন ধরে সূনীলের নিঃশ্বাস। বাড়ির পেছনেই শাক-সবজি বাগান।

কলকাতা থেকে ঘনঘনই আসতেন। দোতালার একটি ঘরে নীরবে নিভৃতে লেখালেখি। বিকেলে নীচে নেমে খোলা বারান্দায় আরাম কেদারায় বসে প্রাণের
আড্ডায় যোগ দিতেন আড্ডাপ্রিয় সুনীল। ঢাকায় কয়েকবার আড্ডায় দেখা হয়েছে প্রাণবন্ত মানুষটির সাথে।

55551962_10218526069452660_3511163299515334656_n.jpg

‘একা এবং কয়েকজন’ এর আড্ডার সঙ্গে ফ্রি ছিল খাওয়া-দাওয়া। বৌদি (স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়) মাছ ভাজার সঙ্গে চা, বেগুনি পরিবেশন করতেন। জমে উঠত আড্ডা। ফরিদপুর থেকে কলকাতা, সাহিত্য সংস্কৃতি, শিল্পকলা, সঙ্গীত আরও কত বিষয়ে কথা হতো। এ ভাবেই ‘একা এবং কয়েকজন’কে নিয়ে বীরভূমের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল সুনীলের। আড্ডায় আড্ডায় কেটে গেছে কত বিকেল কত সন্ধ্যা।

‘আলোর ভুবন’ বইয়ের ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন, “আমি জন্মসূত্রে না হলেও ভূমি সূত্রে বীরভূমের… মাত্র কয়েক বছর আগে শান্তিনিকেতনের অদূরে এক খণ্ড জমি কিনেছি। ভারতের মাটির সঙ্গে তাতেই আমার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।” তারপরেও তিনি ভুলে যাননি জন্মভূমির কথা। জন্মভূমির টানে বারবার ছুটে গিয়েছেন বাংলাদেশে।

55517409_10218526069892671_5180315164154527744_n.jpg

জানতে পারলাম প্রতি বছর বসন্ত উৎসবের আগের দিনই শিল্পী যোগেন চৌধুরীর রতনপল্লির বাড়িতে একটি বসন্ত উৎসবের আয়োজন হত। হাজির থাকতেন সুনীল। দোলের দিন দোলের রঙে নিজেকে রাঙানোর জন্য যেতেন শান্তিনিকেতনে। সবাই ঘটা করে তাঁকে আবীর মাখিয়ে দিতেন। থাকতেন স্বাতী বৌদিও। এখন আর দোল উৎসবে যাননা বৌদি। স্নৃতি দারুণ কষ্টের!

‘একা এবং কয়েকজন’ – এ আড্ডার পাশাপাশি হতো গান-বাজনাও। প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী মোহন সিংহ খাঙ্গুরা স্মৃতিচারণ করেছেন, “প্রায় দিন বিকেলে তাঁর বাড়ি পৌঁছে যেতাম। গানের আড্ডায় গলা মেলাতেন সুনীলদাও।” গান শুনতে ডেকে পাঠাতেন স্থানীয় বাউল শ্যামচাঁদ দাসকেও। গান শুনে খুশি হয়ে টাকাও উপহার দিতেন। শ্যামচাঁদও বলেছেন , “একবার গানের শেষে টাকার বদলে বই উপহার চেয়েছিলাম। ভীষণ খুশি হয়ে তখনই সই করে নিজের বই দিলেন!”

55551962_10218526069452660_3511163299515334656_n.jpg

এখন কী হবে এই সুনীল বিহীন ‘একা এবং কয়েকজনে’র? বাড়ির দীর্ঘদিনের কেয়ারটেকার দীনবন্ধু জানালেন বৌদি নিয়মিত আসেন। স্থাপন করেছেন সুনীলের ভাস্কর্য।

গতবার শান্তিনিকেতন এসে ছিলাম আয়েশ গেস্ট হাউজে। শিল্পী গণেশ পাইন অনেক সাধ করে বাড়ি বানিয়েছিলেন। বিক্রি হয়ে এখন গেস্ট হাউজ। অনেকের স্মৃতির বাড়ি বিক্রি হয়ে গেছে। বৌদির কাছে অনেক স্মৃতিময় এই বাড়িটি। তাই সে সম্ভাবনা কম। আমাদেরও ভাল লাগবে সুনীলের স্মৃতিময় বাড়ি তেমনি থাকলে।

সুনীল শেষবার শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন ২২ সেপ্টেম্বর ২০১২। দিন সাতেক ছিলেন। বয়সের ভারে উঠতে পারেননি দোতলার সেই ঘরে যেখানে বসে লেখালেখি করতেন । নীচের ঘরেই লেখালেখির কাজ সেরেছেন।

দীনবন্ধুর আক্ষেপ, “ফেরার সময় আবার আসব বলে গাড়িতে চাপলেন। কিন্তু আর ফিরলেন না।”

ফুলডাঙ্গায় তো নয়ই এই ধরায় আর ফিরবেন না আমাদের খুব প্রিয় লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। বরাবরই জন্মভূমি বাংলাদেশের মানুষের খুব প্রিয় ছিলেন তিনি। তাঁদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন চিরকাল।

লেখক, আবু আলম শহীদ খান , সাবেক সচিব , বাংলাদেশ সরকার ।

abu-alam