Wednesday April14,2021

ছাত্রলীগ নেতা কামাল সাঈদ মোহনের ২৫শে মার্চের স্মৃতিচারণ, শহীদ চিশতী শাহ হেলালুর রহমানকে স্মরন

শহীদ চিশতী শাহ হেলালুর রহমান

‘সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের দু’শো বারো নম্বর কক্ষটি অনেক স্মৃতিতে বিজড়িত। কে জানতো, হলের দারোয়ান শামসু, স্টুয়ার্ড জলিল, ছাত্র কালাম, মনির, তাহের, জাফর আলম, কাইয়ুমের সঙ্গে ওই কক্ষটির অতি পরিচিত সংগ্রামী, নিবেদিত প্রাণ সাংবাদিক বন্ধুটিকেও আমরা হারিয়ে ফেলবো।…

‘সাবেক ইকবাল হলে মার্চের ৫ তারিখে চিশতী প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকাকে উর্ধ্বে তুলে ধরে সালাম জানায় ও শপথ গ্রহণ করে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার। তার সাথে ছিলেন হল সংসদের তৎকালীন সহ-সভাপতি জনাব জিন্নাত আলী, ছাত্রলীগের হল শাখার দপ্তর সম্পাদক গোলাম মোস্তফা ও আমি।

‘…হলের পাশের দোকানদার খালেক চিশতীর মৃত্যু সম্বন্ধে আমাকে বলেছিল।
‘পঁচিশে মার্চ রাতে হানাদার বাহিনী যখন ঘুমন্ত ছাত্রদের ওপর বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ শুরু করে তখন চিশতী দোতলায় ওর জানালার পাশের হল আর অডিটোরিয়ামের মাঝামাঝি শেডটির ওপর লাফিয়ে পড়ে। সারাটা রাত ওই শেডের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে থাকে চিশতী। জীবনমৃত্যুর লড়াই হলো সারারাত।

‘পূর্বের আকাশ ফরসা হয়ে গেছে। সারারাত গুলিবর্ষণের পর পাকিস্তানী হায়েনাদের যন্ত্রগুলো তখন নিশ্চুপ। অবধারিত মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পেয়েছে, চিশতী হয়তো তাই ভেবেছিলো।
‘হানাদার বাহিনীর কেউ কোথাও আছে কিনা দেখার জন্য চিশতী যখন মাথাটা সামান্য উঁচু করলো, ঠিক তখনই খালেকের দোকানের সামনে পাহারারত হানাদার কুকুরটা তেড়ে এলো।
‘নুরু নামের এক রিক্সাওয়ালাকে লাশ কুড়িয়ে এক জায়গায় জমা করার জন্য বাধ্য করা হচ্ছিল। চিশতী শেডের ওপর থেকে লাফ দিতে চাইলে ও বাধা দিয়ে বললো, “পাইপ বেয়ে নেমে আসুন স্যার, লাফ দিবেন না।” হলের সামনে পুকুরের পাশে মেজর। তার কাছে নিয়ে যাওয়া হলো চিশতীকে।
‘দৈনিক আজাদের বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হিসেবে নিজের পরিচয় পেশ করলো চিশতী। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। হলের পেছনদিক থেকে ডাইনিং হলের দিকে যেতে যে সরু রাস্তাটা—তারই পাশে ড্রেনের কাছে গাছটির নীচে দাঁড় করিয়ে পর পর তিনটি গুলি করা হলো চিশতীকে।…প্রথম গুলিটি যখন ওর বুকের বামপাশ ভেদ করে বেরিয়ে গেল, তখনই তিনি “জয় বাংলা” বলে চিৎকার করে উঠেছিলেন।’
(‘আমার বন্ধু’-মফিজুল ইসলাম, শহীদ চিশতী শাহ হেলালুর রহমানের সহপাঠী ও ও বাংলা একাডেমির সাবেক কর্মকর্তা।)

‘চিশতী কি কোন বধ্যভূমিতে পচে গলে মাটির সাথে গিয়েছিল, নাকি বর্বর বাহিনী পেট্রোল দিয়ে তার দেহটা জ্বালিয়ে দিয়েছিল, তা আমরা কেউ জানতে পারিনি।’ (স্মৃতি: ১৯৭১, তৃতীয় খণ্ড, সম্পাদনা- রশীদ হায়দার)।

শহীদ চিশতী শাহ হেলালুর রহমান ১৯৪৭ সালে, বগুড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবা চিশতী মনসুর রহমান, মা সাজেদা খাতুন। দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন শহীদ চিশতী। তাঁর পৈতৃক বর্তমান স্থায়ী নিবাস বগুড়া শহরের রহমান নগর। ১৯৬৫ সালে ম্যাট্রিক ও ১৯৬৭ সালে আইএ পাস করেন। ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন শাস্ত্রে বিএ (অনার্স) পাস করে এমএ ভর্তি হন। ১৯৭০-৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সম্পাদক ছিলেন। দৈনিক আজাদ পত্রিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ছিলেন, থাকতেন সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে (তৎকালীন ইকবাল হল)। হল ছাত্র সংসদের পাঠাগার সম্পাদক ও বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। উনসত্তরের গণ-আন্দোলন ও একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। একাত্তরের ২৬ মার্চ সকালে পাকিস্তানি হায়েনারা চিশতী শাহ হেলালুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্য !!!. 🤔

২৫ মার্চ ১৯৭১। কামাল সাঈদ মোহন, সিরাজুল আলম খান সহ আরো বেশ কজন ছাত্র নেতার সাথে বংবন্ধুর বাড়ি থেকে মিটিং শেষ করে ইকবাল হলে আসেন।চারপাশে বেশ কানাঘুষা, থম থমে পরিবেশ, রাতে আর্মি নামতে পারে এমন জোর গুজব। হলের বেশিরভাগ ছাত্রই চলে গিয়েছে। মোহন এবং ছাত্র নেতারা গোপনে হলের ছাদে অস্ত্র জমা রেখেছেন যুদ্ধের আগাম প্রস্তুতির জন্য। কাজ শেষে হল গেট দিয়ে বের হবার সময় চিশতি হেলালুর রহমান এবং জিন্নাত ( ছাত্র লীগের ইকবাল হল শাখা সহ সভাপতি,) এর সংে দেখা। মোহন্ এর বাবা বিশ্ববিদ্যালয় এর শিক্ষক, ২০ নম্বর ফুলার রোডে থাকেন। মোহন চিশতি এবং জিন্নাতকে অনুরোধ করেন হল ছেড়ে দিয়ে ওর সাথে বাসায় নিরাপদে চলে আসতে কিন্তু জিন্নাত এবং চিষতি দুজনের কেও রাজী হয়না, ওরা পাক আর্মিকে প্রতিরোধ করবে বলে ঘোষনা দেয়। অগত্যা মোহন একাই বাড়ি ফেরে। এর ঘন্টাখানেক পরেই গোলাগুলি শুরু হয়, ওদের বাড়ির আশে পাশেও গুলি পড়ে। ঘরের ভেতর ছটফট করতে থাকে মোহন, সাথী বন্ধু আর কর্মীদের চিন্তায় কিন্তু বাবার কড়া পাহারার কারনে বের হতে পারেনা। তারপরও মেঝেতে ক্রলিং করে পিছনের দিকে পুকুরপাড় থেকে বাইরে দেখতে থাকে। গুলির শব্দ, মানুষের চিৎকার এরি মাঝে মোহন দেখতে পায় ইকবাল হলের ক্যান্টিন এ আগুন জ্বলছে দাও দাও করে। এভাবেই এক সময় ভোর হয়। চারপাশের শব্দ্ব আর শোনা যাচ্ছেনা, চুপচাপ ভয়ংকর নীরাবতা, আচমকা দরজায় জোরে জোরে কড়া নাড়ার শব্দ, পাশের বাসার এক শিক্ষকের মেয়ে, নামটা থিক মনে নেই “মোহন ভাই মোহন ভাই একজন বড় লিডার গুলি লেগে পড়ে আছেন” প্রথমে ভয় পেলেও দরজা খুলে বেরিয়ে গাড়ি বারান্দার দিকে এগিয়ে যান। এদিক অদিক তাকাতেই হঠাত চোখে পড়ে গাড়ি বারান্দার ছাদের কার্নিশে একটা রক্ত মাখা হাত ঝুলে আছে। গাড়ি বারান্দার টিনের দরজা পেরিয়ে ছাদের দিকে উঠতেই দেখতে পান, ছাদের উপরে গুলিবিদ্ধ জিন্নাত হোসেন। তখনও জ্ঞ্যান আছে সারা শরীর রক্তে ভেজা! মোহনকে দেখে চিনতে পারেন জিন্নাত, বাচার আকুতি ফুটে ওঠে তার চোখ মুখ, অস্ফুট শব্দে নাম ধরে ডাকে। অই অবস্থায় কাধে করে জিন্নাতকে ছাদ থেকে নামিয়ে এনে পাশে বাসার নীচতলায় এক শিক্ষকের বাসায় নক করে প্রায় জোর করেই ঢুকে যান। অই শিক্ষক এবং তার স্ত্রীর আপত্তির মুখেও বাসার পিছনের বারান্দায় জিন্নাতকে শুইয়ে দেন। প্রচন্ড জোরে রক্ত গড়াচ্ছে রক্ত বন্ধ করা দরকার! কিন্তু কিভাবে,ডাক্তার ডাকার উপায় নেই, কিছু তুলার খোজ করলেন মোহন কিন্তু বাসায় কোন তুলা নেই হঠাত করে ট্রেনিং এর প্রাথমিক চিকিৎসার কথা মনে পড়ল তিনি শিক্ষকের স্ত্রীর কাছ থেকে মুখে মাখানোর স্নো চাইলেন আর একটা ওড়না। শিক্ষকের স্ত্রী একটা স্নো কৌটা আর একটা সবুজ ওড়না দিলেন, হ্যা সবুজ ওড়নাই হয়তো, এতদিন পর ঠিক মনে পড়েনা, সেই ওড়না দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে কৌটার স্নো গুলির ক্ষতস্থানে ভরে দিচ্ছিলেন মোহন। এভাবে কিছুক্ষন পরে রক্ত বন্ধ হয়ে আসে জিন্নাতের। কিন্তু তখনই আবারো পাক আর্মি চলে আসে অই এলাকায়। আর্মির গাড়ির শব্দে সবাই ভয় পেয়ে যায়। এই ভাবে আহত কাওকে দেখলে আস্ত রাখবেনা ওদিকে মোহনের মনে পড়ে বাসায় বাবা একা তাকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। মোহনের বাবা Prof Dr.Nurul Haque Bhuiyan . was 1st Convener, বাংলা ভাষা সংরাম পরিষদে , ছিলেন। মোহন অই অবস্থায় জিন্নাতকে ফেলে নিজ বাদার দিকে রওনা দেয় যেতে যেতেই পিছন দিকে তাকিয়ে দেখে ওই শিক্ষক আর তার স্ত্রী মিলে আহত জিন্নাতকে টানতে টানতে বাড়ির পিছনে নিয়ে যাচ্ছেন। তারপরও মোহন চলে যায় নিজ বাবাকে বাচাতে, ওই সময় মোহনের কাছে আহত সহযোদ্ধার চাইতে বাবার জীবন বেশী মুল্যবান মনে হয়েছিল যার গ্লানী আর অপরাধবোধ আজো তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়! প্রতি বছর ২৫ মার্চ্ এর রাত এলেই মুক্তিযোদ্ধা কামাল সাঈদ মোহনের কানে বেজে ওঠে সেই অস্ফুট গোংগানী “ মোহন আমাকে বাচাও” দীর্ঘ ৪৬ বছর পরেও মোহন খুজে ফেরেন জিন্নাত ভাইকে যদি বেচে থাকেন তাহলে ক্ষমা চাইবার সুযোগটা হয়তো পাওয়া যাবে। লেখক, কামাল সাইদ মোহন , পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের নেতা এবং মুক্তিযোদ্ধা ।

অনুলিখন – রওশন আরা নীপা

 

 

 

 

 

 

 

 

.