Friday April16,2021

পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে বিশ্ব ব্যাংক ও সরকারের টানাপোড়েনের সময় নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং একাধিক পত্রিকার সম্পাদক মিলে ‘মিথ্যা অপপ্রচার’ করেছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রোববার চট্টগ্রামের কর্ণফুলি নদীতে বঙ্গবন্ধু টানেল ও লালখান বাজারে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন শেষে এক সুধী সমাবেশে তিনি এ মন্তব্য করেন।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী নিজের নামে পদ্মা সেতুর নামকরণের প্রস্তাব এলেও কেন তা করেননি, তার ব্যাখ্যা দেন।

তিনি বলেন, ‘সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের পদ্মা সেতুর নাম রাখতে চেয়েছিলেন শেখ হাসিনা সেতু। কিন্তু, আমি তা নাকচ করে দিয়েছি। কারণ, এই সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে আমাকে অনেক মিথ্যা অপবাদ ও অপপ্রচারের শিকার হতে হয়েছে। যেহেতু পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে অনেক কিছু হয়ে গেছে, এটার নাম পদ্মা সেতুই হবে।’

ড. ইউনূসকে ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের দেশের লোক আমাদের বদনাম করে। আমাদের দেশের স্বনামধন্য পত্রিকার এডিটর প্লাস মালিক তারা, সঙ্গে আপনাদের চট্টগ্রামের এক সন্তান আছে (ড. ইউনূস), যিনি জনগণের টাকা খেয়ে সুদের ব্যবসা করে নোবেল পেয়েছেন। তারা মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টে আমাদের বিরুদ্ধে সমানে অপপ্রচার করেন।’

তিনি বলেন, ‘আর হিলারি ক্লিনটনের (সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী) কাছে ইমেইল পাঠিয়ে নানাভাবে যোগাযোগ করেন। কাজেই আমি পদ্মা সেতুকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগ যখন পদ্মা সেতুতে মনোযোগ দিল, বিশ্ব ব্যাংকই উৎসাহ দেখিয়েছিল সবচেয়ে বেশি। এত উৎসাহ নিয়ে এসে তারা হঠাৎ মাঝামঝিতে দুর্নীতির অভিযোগ আনল। টাকা ছাড়ের আগেই দুর্নীতিটা হলো কোথায়? তারা এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে নাই। তারপর বলল দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এরপর আমি চ্যালেঞ্জ দিলাম- কোথায় দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হয়েছে। তারা একটা ছোট কাগজ বের করল- যে এখান থেকে ওমুক এত পারসেন্ট পাবে, ওমুক এত পারসেন্ট পাবে…। এভাবে তারা নানা অপপ্রাচার চালাতে শুরু করে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় বসে বসে তারা আমার নামে মিথ্যা অপপ্রচার চালাতো। আমি নাকি বাংলাদেশে সব থেকে দুর্নীতিগ্রস্ত লোক এবং আমার পুরো পরিবার দুর্নীতিগ্রস্ত। আমার নাম নিয়ে বলত তারা। পদ্মা সেতুর টাকা নাকি আমরা লুটে খেয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘সে সময়ে বিশ্ব ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা বাংলাদেশে এসে তদন্ত করেন। কোথায় দুর্নীতি হয়েছে তার প্রমাণ হাজির করতে বলেছিলাম। উপদেষ্টা মসিউর রহমান প্রমাণ চেয়ে বার বার চিঠি লিখেছেন। কিন্তু, দুর্নীতির কোনো প্রমাণ তারা দিতে পারেনি।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘মাঝে মাঝে বিশ্ব ব্যাংকের ভাইস-প্রেসিডেন্ট আসতেন, সঙ্গে একজন অফিসার নিয়ে। হাতে একখান ব্যাগ বগলদাবা করে বসে থাকতেন। আর বলতেন দুর্নীতি হয়েছে, দুর্নীতি হয়েছে। আমি বললাম আপনার ব্যাগের মধ্যে কী কাগজ আছে, বের করেন, দেখান। আমি দেখতে চাই যে কী দুর্নীতি হয়েছে, কে দুর্নীতি করেছে? আমি কী দুর্নীতি করেছি আমি সেটা দেখতে চাই। তারা বলেন, এখন নেই… পরে দেব। পরে আমাদের চাপাচাপিতে একবার দুইখানা চিঠি পাঠাল।’

তিনি বলেন, ‘বিশ্ব ব্যাংকের দেয়া সেই চিঠি ছিল ২০০২ সালের, তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি। চিঠিতে যার নাম ছিল তিনি ছিলেন বিএনপির মন্ত্রী। দুর্নীতির যে অভিযোগ সেখানে ছিল, তার একটা ছিল ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক, অন্যটা সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন নিয়ে। পদ্মা সেতুর কোনো যোগাযোগ সেখানে ছিল না।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘কানাডার আদালতে একটা মামলা হয়। কিন্তু, সেই মামলায় দুর্নীতির কোনো প্রমাণ বিশ্ব ব্যাংক দেখাতে পারেনি। মামলার রায়ে বলে দেয়া হয় যে, এখানে কোনো দুর্নীতি হয়নি, যা যা বলা হয়েছে সব ভুয়া এবং বানোয়াট।’

তিনি বলেন, ‘বিশ্ব ব্যাংকের ওই অভিযোগ নিয়ে টানাপোড়েনে দুই বছর নষ্ট হয়। অনেকের ধারণা ছিল, বিশ্ব ব্যাংককে ছাড়া পদ্মা সেতু সম্ভব না। কিন্তু, বাংলাদেশ নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করতে পেরেছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পদ্মা সেতু নিয়ে যেহেতু এতকিছু হয়ে গেছে, এটা ‘পদ্মা সেতুই’ থাকবে। এটার সঙ্গে আর কোনো নতুন নাম যুক্ত হওয়ার প্রয়োজন নাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার বাবা এই দেশের জন্য সারাটা জীবন কষ্ট করেছেন। আমার মা কষ্ট করেছেন। এই দেশ স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। এই দেশের গরীব দুঃখী মানুষের জন্য তিনি কষ্ট করে গেছেন। দেশকে এমনভাবে গড়ে তুলব-যেন সারা বিশ্ব বিস্ময়ের সঙ্গে তাকিয়ে থাকে বাংলাদেশের দিকে। এটাই আমার চাওয়া, আর কিছু নয়।’