Sunday April11,2021

গত কয়েকদিন লন্ডন ছিলাম, এই সময়টায় লন্ডনেও বেশ ঠান্ডা ছিলো। টেমস্ নদীর উপর দিয়ে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া শরীরকে বেশ ভালোই জানান দেয় লন্ডনের ঠান্ডা । সাথে আবার লন্ডনের বারো মাসের বৃষ্টির ঝাপটাও একেবারেই কম ছিলো না। ইতিপূর্বে অনেকবার লন্ডন যাওয়া হলেও , লন্ডন শহরকে তেমন নিখুঁতভাবে ঘুরে দেখা হয়নি। তবে এবার এই ঠান্ডা হাওয়ার সাথে বৃষ্টির সাথি হয়ে গত পাঁচদিন লন্ডনের পথে পথেই সময় পাড় হয়েছে। যতটুকুন সম্ভব হয়েছে পিঠে একটি ব্যাগ ঝুলিয়ে প্রায় সমগ্র লন্ডনের পথেই পা মারিয়েছি। তাপমাত্রা খুব বেশি নিম্নমুখী ছিলো না, তবে বৃষ্টি আর হাওয়ার সাথে সাড়াদিন পথ চললে খুব স্বাভাবিকভাবেই নিজের শরীরের তাপমাত্রার পারদ নিম্নমুখী হতে থাকে। মাঝে যতই গরম কফি, গরম চকলেট কিংবা গরম ব্লাক টি গলদ গ্রহণ করা হোক, খুব বেশি কাজে আসে না। যা হোক, সেই ঘোরাঘুরি পথে রাজার বাড়ি থেকে শরু করে প্রায় সব আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থানেই এবার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। সত্যি বলতে দুই চারদিনে লন্ডন ঘুরে শেষ হয় না। আদি শহর, সাথে এখন আধুনিকতার সর্বোচ্চ সংযোগ, এই শহরে ঘোরাঘুরির আনন্দটাই একটু ভিন্ন। সাথে প্রশংসনীয় যোগাযোগ ব্যাবস্থা । পৃথিবীর অনেক দেশের চেয়েই লন্ডনের যোগাযোগ ব্যবস্থা বেশ ভালো এবং দীর্ঘ যোগাযোগ ব্যবস্থা, অর্থাত সব জায়গাতেই বাস-ট্রেন-আনডারগ্রাউন্ড রেল- ট্রামবাই দিয়ে যাতায়াত করা যায় । লন্ডন শহরের অতীত এবং বর্তমান ভ্রমণের বিষয় নিয়ে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা আছে এবং লিখবো।

 

আজকে যা লিখতে চাচ্ছি, তা সত্যি সত্যি গণতান্ত্রিক বৃটিশ দেশের লন্ডন শহরের সত্যিকারের একটি গণতান্ত্রিকতার কাহিনী। লন্ডন শহর এমন একটি শহর যেখানে পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নাই , যে দেশের মানুষ বসবাস না করে। এই শহরে একটু ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বেশ লম্বা সাদা চামরার মানুষের সাথে হয়তো কালো মোটা কিংবা বেটেখাটো চাইনিজ বা জাপানি অথবা বাদামি রংয়ের ইন্ডিয়ান-পাকিস্তানি- শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশী একসাথে দলে দলে চলছে। এই শহরে বর্ণবাদ বিষয়টি ইউরোপের অন্যান্য দেশের ধারেকাছেও নেই। যেহেতু পৃথিবীর প্রায় সব দেশের মানুষের বসবাস এই শহরে, তাই আচরণের দিক থেকে বর্ণবাদ- বর্ণবৈষম্য বিষয় গুলো ক্ষীণ হয়ে এসেছে। এই শহরে টুরিসদের সাড়াবছর আনাগোনা থাকে, সে দিক থেকে এই শহরে আপনি যে দেশেরই হোন চলাচলে বেশ আলাদা আমেজ পাওয়া যায় । অল্প কথায় বলা যায়, ভালো অনুভূতি ।

গ্রীষ্মকালে এই শহরে মানুষের ঢলতো লেগেই থাকে , এমনকি শীতেও এই শহরের যেকোনো আনাচেকানাচে  মানুষের ভীড়। যাহোক, এক সন্ধ্যায় লন্ডন শহরের “পিকাডেলি” আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনের বাহিরের রাস্তার পাশে এক কফি হাউজে আমি এবং মেলিহা ( আমরা অস্ট্রিয়া থেকে এসেছি) আমাদের দুই বন্ধু বাংলাদেশ থেকে আগত , সাইফুল্লা এবং নাসিরের অপেক্ষায় বসে আছি। সাড়াদিন হাঁটাহাঁটির পর গরম কফি পানে ব্যস্ত । আমি একটু পর পর রাস্তার মোড়ে তাকিয়ে দেখি ওদের আগমন হয় কিনা । এদিক সেদিক দেখার মাঝেই যা দেখলাম , সেটা সত্য আমায় বিস্মিত করেছে। হঠাত্ দেখি রাস্তার একপাশে জনমানুষের ভীড়ের একজন ইয়াং ছেলে ইলেকট্রনিক্স গিটারের সাথে কি চমত্কার  গান বাজিয়ে চারিদিকে মানুষের ভীড় জমিয়েছে। তার কিছু দূর পরেই আরো একজন ছেলে আর মেয়ে মিলে নানান রকম শারীরিক কৈশরত আর সাথে অনেক ধরনের খেলা দেখিয়ে মানুষের ভীড় জমিয়েছে। চারিদিকে মানুষের গমগম ভাব। ইউরোপের প্রতিটি দেশেই রাস্তায় রাস্তায় এরকম নানান শো খুবই স্বাভাবিক বিষয় । আমি আমার বন্ধুর কল পেয়ে কফি হাউজ থেকে বেড় হয়ে রাস্তার সামনের দিকে এগোচ্ছি, ঠিক তখন রাস্তার অন্য পাশে দেখি একজন গির্জার পাদ্রি বড় আকারের একটি জিসাসক্রাইস্ট হাতে খ্রিস্টান ধর্মের বাইবেল থেকে ধর্মের নানান কথা মানুষদের বলছেন এবং বিনি পয়সায় বাইবেল বিলাচ্ছেন। বাইবেল গুলো একটি ছোট্ট টেবিলে থরে থরে সাজানো। তার এই টেবিলের গা ঘেঁষে আরো একটি টেবিলে থরে থরে কোরান শরীফ সাজানো । সেই টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে একজন ইমাম বা ধর্ম প্রচারক পরিমিত লাউড স্পিকারে কোরান তেলাওয়াত করছেন , সাথে বিনি পয়সায় কোরান জনমানুষের মাঝে বিলি করছেন। ইউরোপের দেশে এভাবে বাইবেল আর কোরান একসাথে প্রচার আমি এই প্রথম দেখলাম। ইউরোপের রাস্তায়  কখনো কখনো জিসাসক্রাইস্ট হাতে অনেক ধর্মজাজককে সাধারণত বড়দিন উপলক্ষে বাইবেল প্রচার করতে দেখেছি কিন্তু কোরান এভাবে প্রচার করতে দেখিনি। আমি বিশ্বাস করি ব্রিটিশরা সত্যি গণতান্ত্রিক তাই একসাথে গণতান্ত্রিক অধিকার বলেই এটা হচ্ছে। আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে তাদের কর্মকা দেখলাম আর ভাবলাম ধর্মতো সত্যি অর্থে শান্তির জন্য । ধর্মে ধর্মে তো কোনো ক্লেশ নাই ! তাহলে পৃথিবীতে মানুষ কেন ধর্মকে অবলম্বন করে এত রক্ত ঝড়ায়? আজকের সিরিয়ার শিশুদের দেখলে কারো ভিতরে যদি সামান্যতম মনুষ্যত্ব থাকে তাহলে হৃদয় কেঁপে উঠার কথা! সত্যি বলতে আমি হঠাত্ আমার বন্ধুদের ফোন পেয়েই আবার অনেকটা নিজেস্ব স্বকীয়তায় ফিরে আসি। বন্ধুদের সাথে মিলিত হবার জন্য দুপা সামনে বাড়াই আর ভাবতে থাকি, ব্রিটিশরা আর যাই হোক ওদের দেশে ওরা সত্যিকারের গণতন্ত্র কে চর্চার মাধ্যমে   ধারণ করতে পেরেছে। এই পৃথিবীর অনেক দেশ ব্রিটিশদের নিকট সত্যি গণতন্ত্র শেখতে পারে। ” ওয়েস্ট মিনিস্টার ডেমোক্রেসি ” এটা শুধু কথার কথাই নয় , এটা প্রমাণিত সত্য ।

20190208_162304

বুলবুল তালুকদার
সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম