Wednesday April14,2021

অগ্রাহ্য অধিকাংশের দাবি, ভোটকেন্দ্র হলের বাইরে নেয়ার দাবিতে কর্মসূচি ঘোষণা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গঠনতন্ত্র সংশোধন ও আচরণবিধি প্রণয়ন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সিন্ডিকেটের এক সভায় গঠনতন্ত্র সংশোধন ও আচরণবিধি চূড়ান্ত করা হয়। সংশোধিত গঠনতন্ত্র ও আচরণবিধি নিয়ে ছাত্রলীগ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ পরিষদভুক্ত অন্যসব ছাত্র সংগঠনেরই দাবি উপেক্ষিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে পরিবেশ পরিষদের সভায় উপস্থিত ১৪টি ছাত্র সংগঠনের ১৩টি যেখানে ভোটকেন্দ্র  হলের পরিবর্তে নিকটস্থ অনুষদে করার প্রস্তাব করেছে, সেখানে একমাত্র ছাত্রলীগের দাবি অনুযায়ী  হলেই রাখা হয়েছে ভোটকেন্দ্র।

ডাকসুর গঠনতন্ত্রেও হলে ভোটকেন্দ্র স্থাপনের কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু সময়ের চাহিদা অনুযায়ী এবার হলের পরিবর্তে অনুষদে ভোটকেন্দ্র করার প্রস্তাব করেছিল ছাত্রদল ও প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র স্থাপনের দাবি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। অবশ্য ১৯৯৪ সালে একই ইস্যুতে আন্দোলনের মুখে তফসিল ঘোষণার পরও ভোটগ্রহণ স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছিলেন তৎকালীন ভিসি অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীনের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন।

তখন ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল ছাড়া ছাত্রলীগসহ অন্যরা হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র স্থাপনের দাবি করেছিল। তখন প্রশাসন গঠনতন্ত্রে নেই বলে হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র নিতে অপারগতা জানায়। সময়ের পরিক্রমায়, বর্তমানে বড় দুই ছাত্র সংগঠন ১৯৯৪ সালে রাখা নিজ নিজ বক্তব্যের বিপরীতে অবস্থান করছে।

ভোটকেন্দ্র ছাড়াও কারা ভোটার ও প্রার্থী হতে পারবেন সেখানেও ছাত্রলীগের ইচ্ছের প্রতিফলন হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ছাত্রদল সহ প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলো। ক্যাম্পাসে সব ছাত্র সংগঠনের জন্য সহাবস্থান তৈরি হয়নি বলেও অভিযোগ তাদের। এমন পরিস্থিতিতে ভোটকেন্দ্র হলের বাইরে নিতে কঠোর কর্মসূচি হাতে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে তারা। প্রয়োজনে নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ারও ইঙ্গিত দিয়েছে কয়েকটি ছাত্র সংগঠন। এদিকে গত মঙ্গলবারের সিন্ডিকেটের সভায় হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র নেয়ার দাবির বিষয়টি ওভাবে ওঠেনি বলে জানিয়েছেন সিন্ডিকেট বডিতে থাকা বিএনপি-জামায়াতপন্থি একমাত্র শিক্ষক প্রতিনিধি অধ্যাপক ড. হাসানুজ্জামান। গতকাল সন্ধ্যায় তিনি মানবজমিনকে বলেন, ‘হলের বাইরে ভোট কেন্দ্র করার বিষয়টি গতকাল সিন্ডিকেটের সভায়ও ওভাবে উঠানো হয়নি। বলছে, পূর্বের গঠনতন্ত্রে যেভাবে ছিল হলে ভোটকেন্দ্র করার, সেটি হলেই থাকছে। এর আগেও উপদেষ্টা পরিষদের সভায় হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র করার জন্য আমি প্রস্তাব করেছি। আমি বলেছিলাম বিভিন্ন অনুষদে হলভিত্তিক ভোটকেন্দ্র করা যেতে পারে। কিন্তু আমার বক্তব্যকে পাত্তা দেয়া হয়নি। তারা বলেছে, হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র হওয়ার নিয়ম নেই। সেদিন উপদেষ্টা পরিষদের আরো কয়েকজন সদস্য ১৯৯৪ সালে একই ইস্যুতে ভোট স্থগিতের কথা উঠিয়েছিল। কিন্তু চূড়ান্তভাবে হলেই ভোটকেন্দ্র করার ব্যাপারে তারা সিদ্ধান্ত নেয়।’

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হাসান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গঠনতন্ত্র ও আচরণবিধি নিয়ে পরিবেশ পরিষদভুক্ত ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে যতগুলো সভা করেছেন সবগুলোতে একটি মাত্র ছাত্র সংগঠন ছাড়া অন্য ১৩টি সংগঠনই হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র স্থাপনের দাবি করেছিল। যাতে করে সবাই নির্বিঘ্নে ভয়ভীতি ছাড়া ভোট দিতে পারে। কিন্তু প্রশাসন সেটি করেনি। তাদের এমন সিদ্ধান্ত ৯৯ শতাংশের মতকে অগ্রাহ্য করা। এটা অনভিপ্রেত। তবে আমরা এখনো আশাবাদী তফসিল ঘোষণার আগে প্রশাসন বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবে। নতুবা আমরা সব ছাত্র সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হবো।’ ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার সিদ্দিকী বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যে গঠনতন্ত্র ও আচরণবিধি প্রকাশ করেছে তা দেখে প্রতীয়মান হচ্ছে এটি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও পূর্বপরিকল্পিত।

এ পর্যন্ত ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যত কমিটি করা হয়েছে। তা পর্যালোচনা করলে আমরা বলতে পারি সরকারদলীয় শিক্ষকদের দ্বারা সমন্বয় করা হয়েছে। আমরা দাবি করেছি নিরপেক্ষ শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তি। কিন্তু তা করা হয়নি। আমরা এ ব্যাপারে স্পষ্টভাবে বলতে চাই এসব কমিটির ভিসিসহ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের প্রিয় নিজস্ব একটি সংগঠনের ইচ্ছের প্রতিফলনই ঘটিয়েছেন সংবিধান ও আচরণবিধিতে।’ তিনি বলেন, ‘হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র স্থাপন ও বয়সের বিষয়ে শুধুমাত্র একটি সংগঠন ছাড়া অন্য কারো বক্তব্য গ্রহণ করা হয়নি। শিক্ষার্থীদের পরিচয় হয়- নিয়মিত বা অনিয়মিত। কিন্তু ৩০ বছর কেমন কাইটেরিয়া? একটি সংগঠন বলেছে ৩০ বছর করার জন্য। তা হয়েছে। তারা বলেছে হলে ভোটকেন্দ্র স্থাপনের তা করা হয়েছে। আমাদের মনে হয় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত তাদের বক্তব্যের কপি পেস্ট।’

বাশার সিদ্দিকী আরো বলেন, ‘আমাদের দাবিগুলো সংবিধান ও আচরণবিধিতে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। আমরা এটাকে প্রত্যাখ্যান করছি। এ পরিবেশে নির্বাচন হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বলবো এ সমস্ত হটকারী ও হীন সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে। সকল শিক্ষার্থীর দাবির আলোকে নির্বাচনী পরিবেশ গড়ে তুলতে। এরপর তফসিল ঘোষণা করতে। নতুবা ডাকসু নির্বাচনও জাতীয় নির্বাচনের মতো প্রহসনে পরিণত হবে।’ বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজীর বলেন, ‘আমরা মনে করি এই নির্বাচন হবে পাতানো নির্বাচন।

প্রশাসন তাদের মতো করে ছাত্রলীগকে জেতানোর নির্বাচন করতে চায়। আমরা মনে করি এখন ভোটকেন্দ্র বাইরে নিয়ে আসার দাবিতে আন্দোলনটা করতে হবে। এ আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের বিজয়টা নিশ্চিত করতে হবে। এটা না হলে আমরা নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করতে হবে।’ অধিকাংশের দাবির পরও হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে গঠনতন্ত্র সংশোধন না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মু. সামাদ বলেন, ‘হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র স্থাপনের দাবি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।’ এক্ষেত্রে ১৯৯৪ সালে একই কারণে তফসিল ঘোষণার পরও ভোটগ্রহণ স্থগিতের বিষয়ে ইঙ্গিত করা হলে তিনি বলেন, ‘সেটা ছাত্রদের ব্যাপার। ছাত্রদের দাবি। এখনো ছাত্রদের দাবি। প্রশাসন সেটি করতে পারে না। এটা নৈতিকতার প্রশ্ন। আমরা শিক্ষকরা এখানে কাজ  করবো। এটা তো উপজেলা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন না। যে এ দাবি করবে, ওই দাবি করবে।’ ছাত্র সংগঠনগুলোর আন্দোলনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আন্দোলন করুক, দেখি কী হয়।’ গঠনতন্ত্র ও আচরণবিধিতে একটি নির্দিষ্ট ছাত্র সংগঠনের ইচ্ছের প্রতিফলন হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে অধ্যাপক মু. সামাদ বলেন, ‘এ অভিযোগ সত্য না। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ সকলের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করা হয়েছে।’

ছাত্রদল নেতাকে মারধর ছাত্রলীগের: বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক বুরহান উদ্দিনকে মারধর করেছে ছাত্রলীগ। গতকাল বিকালে রেজিস্ট্রার ভবন সংলগ্ন মল চত্বর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আহত বুরহান ছাত্রদল থেকে ডাকসু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা রয়েছে। আহত বুরহান অভিযোগ করেন, তিনি ব্যক্তিগত কাজে রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ে আসছিলেন। এসময় ছাত্রলীগের ঢাবি শাখার সভাপতি সনজিৎ চন্দ্র দাসের নেতৃত্বে ১০ থেকে ১৫ জন ছাত্রলীগের নেতা তাকে অনুসরণ করছিল। একপর্যায়ে তিনি রেজিস্ট্রার ভবন থেকে বের হলে আগে থেকেই ওত পেতে থাকা ছাত্রলীগ নেতারা তার ওপর রড, স্টাম্প ও লাঠি নিয়ে হামলা করে। এতে তিনি গুরুতর আহত হয়ে সংজ্ঞা হারান। পরে ছাত্রলীগ নেতারা তার কাছে থাকা একটি মোবাইল কেড়ে নেন। তিনি আরো বলেন, ১০ থেকে ১২ মিনিট পর জ্ঞান ফিরলে তিনি হেঁটে প্রক্টর অফিসে আসেন। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার জন্য প্রক্টরকে জানান। কিন্তু সেখানে উপস্থিত থাকা এক সহকারী প্রক্টর তাকে কটাক্ষ করে বলেন যে, তোমার জন্য প্লেন আনবো? পরে প্রক্টর টিমের সদস্যরা তাকে ঢাকা মেডিকেলের ফটকে রেখে আসে। পরে তিনি হেঁটে মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগে এসে চিকিৎসা নেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার সিদ্দিকী বলেন, আজও আমাদের জহুরুল হক হলের যুগ্ম আহ্বায়ককে মারধর করেছে ছাত্রলীগ। এটা কি নির্বাচনের পরিবেশ হতে পারে? এ বিষয়ে ঢাবি প্রক্টর অধ্যাপক ড. একেএম গোলাম রাব্বানী বলেন, সে আসার সঙ্গে সঙ্গে তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। সে লিখিত অভিযোগ করলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। বুরহান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন প্রক্টর। তিনি বলেন, তার আচরণ সন্তুষ্টজনক ছিল না। তাছাড়া সে কোনো পরিচয়পত্র দেখাতে পারেনি।