Tuesday March9,2021

যে মুহূর্তে এই লেখাটি লিখতে শুরু করেছি তখন বাংলাদেশের প্রায় সব অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং পত্রপত্রিকার অনলাইন ভার্সনগুলোতে‌ সম্প্রতি গঠিত হওয়া বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য নিয়ে এই সরকারের সর্বোচ্চ দুজন ব্যক্তি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের দুটি বক্তব্য দেখতে পাচ্ছি। বলাবাহুল্য, দুটি বক্তব্যই জোটের প্রতি নেতিবাচক। এতে অবাক হইনি, বরং এটাই আসলে হওয়ার কথা ছিল।

বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে আমাদের দেশের সব মিডিয়ায় খুব গুরুত্ব পাচ্ছে রাজনৈতিক জোট গঠনের সংবাদটি। এটা নিয়ে শুধু সংবাদই নয়, নানা রকম মতামত বিশ্লেষণও হচ্ছে। মতামতগুলোতে রাজনৈতিক জোট গঠনকে প্রশংসা করা হয়েছে বা উৎসাহ দেওয়া হয়েছে, এরকম লেখা আমি ঠিক মনে করতে পারি না। আমার পড়া সবক’টি লেখাই এই জোটের প্রতি সমালোচনা বা তীব্র ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে পূর্ণ

যদ্দূর মনে পড়ে বিদ্রূপের শুরুটা প্রথম মাননীয় প্রধানমন্ত্রীই শুরু করেছিলেন। কয়েক মাস আগে, যুক্তফ্রন্ট গঠন করার পরে, যুক্তফ্রন্টের গঠন নিয়ে একটা সংবাদ সম্মেলনে যখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়, তখন তিনি খুব স্পষ্টভাবে একটা সমীকরণ জানিয়েছিলেন আমাদের, জিরো + জিরো + জিরো = জিরো। এরপর বিমসটেক সম্মেলনের পর সর্বশেষ যে সংবাদ সম্মেলনটি হয়, সেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যুক্তফ্রন্টের তিন নেতা প্রফেসর বি. চৌধুরী, মাহমুদুর রহমান মান্না, আ স ম আব্দুর রব ও গণফোরামের নেতা কামাল হোসেনকে নিয়ে হালকা চালে বেশ কিছু ছড়া কেটে ঠাট্টা-রসিকতা করেছিলেন। এই কাজে তিনি সংবাদ সম্মেলনের দীর্ঘ ৬ মিনিট ব্যয় করেছিলেন। কেউ কেউ বলবেন, দুটি সংবাদ সম্মেলনেই তিনি তো জোট গঠনকে স্বাগতও জানিয়েছিলেন। জোট গঠন নিয়ে দীর্ঘ সময় নিয়ে নেগেটিভ কথা বলার পর একবাক্যে স্বাগত জানানোটা যে শুধু কথার কথা, এটা বোঝা যায়।

রাজনৈতিক জোট গঠন করার প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই ধরনের অবস্থান মিডিয়াতে এক ধরনের উৎসাহ জুগিয়েছে। অত্যন্ত বয়োজ্যেষ্ঠ, অত্যন্ত স্বনামধন্য বিশ্লেষক থেকে শুরু করে অপেক্ষাকৃত তরুণ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও এই জোট গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে নানারকম বিদ্রুপ করেছেন, এখনো করছেন। এ পর্যন্ত যারা পড়েছেন, তাদের মনে হতে পারে, এই ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের ব্যাপারটা আলোচিত রাজনৈতিক জোট গঠনের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে আমাকে সম্ভবত খুব আহত করেছে। না, আমি এই ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে বরং খুশিই হয়েছি। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে প্রতিপক্ষের গঠনমূলক সমালোচনা, এমনকি ‘অগঠনমূলক’ ব্যঙ্গ-বিদ্রুপও গ্রহণ করার মতো মানসিকতা আমি রাখি। কিন্তু এই প্রেক্ষাপটটা উল্লেখ করেছি এই কারণে এটা পাঠককে বুঝতে সাহায্য করবে সাম্প্রতিককালে যে রাজনৈতিক জোট গঠিত হতে যাচ্ছে সেটাকে সমর্থন করে না গেলেও অন্তত ইগনোর করা যাচ্ছে না। আমরা মনে রাখবো, ‘নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াও একটা প্রতিক্রিয়া’।

সরকারি দলের পক্ষ থেকে এমন একটা সময়ে এই জোট গঠনকারী দলগুলোকে বিদ্রুপ করা হচ্ছে, যখন সরকারি দল তাদের জোটের জন্য আগামী নির্বাচনে ৭০টির মতো আসন ছেড়ে দেবে বলছে। অনুমান করি এই সংখ্যা আরও বাড়বে। আলোচনার খাতিরে তথাকথিত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কথা সত্যি ধরে নিই- বিএনপি একটা ডুবন্ত দল, তাই ‘জিরো’দের সঙ্গে জোট গঠন করাটা তাদের কাছে খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো ব্যাপার। কিন্তু বর্তমান সরকার আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত শক্ত অবস্থানে বসে থেকে কেন ৭০ বা তার বেশি আসন তার শরিকদের ছেড়ে দেবে? জোটের প্রার্থীদের জন্য ক্ষমতাসীন দল তাদের দীর্ঘকাল দল করা নেতাগণকে মনোনয়ন বঞ্চিত করছে কেন?

আমরা জানি, সরকারি জোটের শুধু জাতীয় পার্টির ৮/১০ জন প্রার্থী হয়তো স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে জেতার ক্ষমতা রাখেন, কিন্তু বাকিদের সবাই তো প্রধানমন্ত্রীর পরিভাষায় ‘জিরো’। তবু এদের কেন আসন ছেড়ে দেওয়া হবে? এতটাই কি রাজনৈতিক প্রজ্ঞাহীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী? মজার ব্যাপার সরকারি দলের এই রকম ‘জিরো’দের নিয়ে জোট গঠন এবং জোটের প্রার্থীদের আসন ছাড়া নিয়ে কিন্তু কোনও মতামত-বিশ্লেষণ আমরা মিডিয়ায় দেখছি না। এভাবেই বহু ‘রাজনৈতিক ভাষ্যকার’ সাচ্চা রাজনৈতিক ভাষ্যকার না হয়ে হয়ে ওঠেন একটা দলের মুখপাত্র।

বাজারের যোগান নির্ধারিত হয় চাহিদার ভিত্তিতে। কোনও কিছুর যোগান বাজারে থাকার মানেই হচ্ছে সেটার চাহিদা আছে। তাই আজ মিডিয়া যখন এই রাজনৈতিক জোট নিয়ে প্রতিদিন সংবাদ করছে, মতামত প্রকাশ করছে, তখন এটা বুঝতে হয় মিডিয়ার যে মূল গ্রাহক, অর্থাৎ পাঠক বা দর্শকরা নিশ্চয়ই এটাই চাইছে। এটা বুঝেই কি এতটা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ? এতটা তাচ্ছিল্য?

এই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দলগুলো এই বাস্তবতা আশা করি বুঝতে পারছে, ক্রমশ আরও বেশি কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে ওঠা একটা সরকারকে একটা সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে আসতে বাধ্য করার জন্য সবার একত্রিত হওয়ার কোনও বিকল্প নেই। নাগরিকরাও এরকম বিশ্বাস পোষণ করেন বলেই যখন ক্ষমতাসীনদের জোটের বাইরের সবক’টি রাজনৈতিক দল এক জোট হচ্ছে তখন সেটা মানুষকে আশাবাদী করে তুলছে। মানুষ যখন দেখছে দল-মত নির্বিশেষে মানুষ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ২০১৪ সালে হাতছাড়া হয়ে যাওয়া ভোটের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য এগিয়ে আসছে, তখন মানুষ আবার নতুন করে আশাবাদী হচ্ছে।

আমরা খেয়াল করবো কিছুদিন আগে গঠিত হওয়া যুক্তফ্রন্ট এবং জাতীয় প্রক্রিয়ার যে জোট সেটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য যায়নি। বরং বিএনপি স্বতন্ত্রভাবেই এই জোটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করতে চেয়েছে। দীর্ঘকাল মাঠের রাজনীতি করা বিএনপির সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে রাজনৈতিক প্রজ্ঞাহীন মনে করাটা বোকামি। সাম্প্রতিক রাজনীতি থেকে এটা স্পষ্ট, এই দেশের সবচাইতে বেশি জনসমর্থনের অধিকারী দুটি দল বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ নিশ্চিতভাবে এটা বুঝতে পারছে, শুধু ভোটের সংখ্যা দিয়ে একটা দলকে বিবেচনা করা ভুল। তাই মুখে জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার কথা সরকারি দলের নেতারা এবং কিছু ‘রাজনৈতিক বিশ্লেষক’ যে বলেন, তার ভেতরে কি আছে অন্য কোনও কথা? অন্য কোনও হিসাব?

পেশাগত কারণে যিনি এসবেস্টসের মধ্যে থাকেন, তার ফুসফুসে ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি। আবার যিনি ধূমপান করেন, তারও ফুসফুসের ক্যানসারের বেশি ঝুঁকি আছে। এখন একজন ধূমপায়ী যদি পেশাগত কারণে এসবেস্টসের মধ্যে থাকেন তবে তার ফুসফুসে ক্যানসারের ঝুঁকি আলাদা আলাদাভাবে দুটির ঝুঁকির যোগফলের চাইতে অনেক বেশি হবে। এটাই সিনার্জি। ইংরেজি ‘সিনার্জি’ শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ নেই সম্ভবত। বিষয়টিকে এভাবে বোঝানো যায়, যখন দুই বা ততধিক বিষয়ের সংযুক্ত প্রভাব সেসব বিষয়ের গাণিতিক যোগফলের চাইতে বেশি হয় তাই সিনার্জি। অর্থাৎ সিনার্জির ক্ষেত্রে ২ আর ২-এর যোগফল ৫ বা ততধিক হতে পারে।

আমাদের বড় দুই দল আসলে জানে, ছোট দলগুলোর কয়েকটি একত্র হয়ে সিনার্জি তৈরি করার ক্ষমতা রাখে। আর তারা যদি বড় দলগুলোর কোনটিকে সঙ্গে পায় তখন সিনার্জি আরও প্রবল হয়ে ওঠে। তাই এককভাবে নাগরিক ঐক্য, জেএসডি বা বিকল্প ধারার শক্তিমত্তা যতটা, এই তিন দল নিয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্ট এদের শক্তির যোগফলের চাইতে আরও অনেক বেশি শক্তিশালী। এর সঙ্গে যখন ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া জোট বাঁধে তখন সেটা আরও অনেক শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সর্বশেষ যখন দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দুটির একটি এই জোটে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তখন এর সম্ভাব্য সিনার্জির শক্তিটা এতটাই বেশি হয়ে ওঠে যে এটাকে সরকার প্রচণ্ড ভয় পেতে শুরু করেছে।

গ্রামাঞ্চলে ভূতে ভয় পাওয়া মানুষ ভূতের সম্ভাব্য আবাসস্থল বাঁশঝাড়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় উচ্চস্বরে গান গায়। এই গান কেউ শুনুক বা না শুনুক, কিছু আসে যায় না, এই গান অন্তত তাদের নিজের ভয় কাটায়। সরকারবিরোধী দলগুলোর জোট গঠন নিয়ে সরকরি দলের নেতা এবং ‘রাজনৈতিক বিশ্লেষক’দের তীব্র বিদ্রুপ আর তাচ্ছিল্য জনগণের ওপর কোনও প্রভাব ফেলে না এটা আমি নিশ্চিত, কিন্তু এটা সরকারি দলের জনগণের ম্যান্ডেটহীনভাবে ক্ষমতা আরও দীর্ঘায়িত না করতে পারার ভীতি কমাতে সাহায্য করতেই পারে। সেই বিবেচনায় এটার একটা উপযোগিতা তো আছেই। তাই নিশ্চিতভাবেই জানি, এসব তাচ্ছিল্য চলতেই থাকবে অনাগত দিনেও; আর এটা আমাদের কাছে প্রমাণ করবে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য তার লক্ষ্যের দিকে ঠিকঠাক এগিয়ে যাচ্ছে।  সুত্র : বাংলা ট্রিবিউন

লেখক: সদস্য, যুক্তফ্রন্ট-জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া ঘোষণাপত্র প্রণয়ন কমিটি।