Monday March8,2021

প্রত্যাখ্যান ব্যর্থতা নয়, আরেকটি নতুন শুরুর ইঙ্গিত – অপূর্ব চৌধুরী

 

resilience

Resilience: Facing Down Rejection and Criticism on the Road to Success by Mark McGuinness.  Publisher: Lateral Action. Page: 285. Published: 2013

সফল লোকদের দেখলে সবাই কম বেশি ঈর্ষান্বিত হয় সৃষ্টিশীল মানুষের ক্ষমতা আকর্ষণ করে আবার একইসাথে ভাবায় যে, চাইলে তো নিজেরাও এমন হতে পারে যখনই এমনসব কৌতূহলের উত্তর খুঁজে নিজের ভেতর, বেশ কিছু বাধার মুখোমুখি হয় প্রথমে ভেবে নেয়হয়তো সেই সব সৃষ্টিশীলরা জন্মগত প্রতিভাবান, যা নিজের মধ্যে নেই, হয়তো ভেবে নেয়নিজের সে স্বপ্নের রসদ নেই, শক্তি নেই, যোগ্যতা নেই, যেন সাধ আছে সাধ্য নেই লেখক প্রথমে সাফল্যের পথে প্রধান বিঘ্ন হিসাবে চিহ্নিত করেন সমালোচনা এবং প্রত্যাখ্যানের ভীতি এটাকে কিভাবে মোকাবেলা করে নিজেকে স্বাভাবিক কর্ম পথে চালু রাখতে হবে, নিজের লক্ষ্যে যেতে হবে, স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপ দেয়া যাবে, তারই কিছু নির্দেশনা, উপলব্ধি এবং কর্মপন্থা বাতলে দিয়েছেন

Resilience শব্দের সহজ অর্থ স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরা ২০১৩ সালে প্রকাশিত Mark McGuinness এর একটি বই মূল বিষয় সৃজনশীলতা কিন্তু তা অর্জনের পথে কিছু বাধা আছে, যা সৃষ্টিশীল সত্তাকে অনেক সময় থামিয়ে দেয়, কেড়ে নেয়, কিংবা অনুৎসাহিত করে বইয়ের নামেই রয়েছে ভেতরে কি আছে, এই অন্তরায় অতিক্রমের উপায় Facing Down Rejection and Criticism on the Road to Success সাফল্যের পথে প্রত্যাখ্যান এবং সমালোচনার মুখোমুখি হওয়া পথ চলতে গিয়ে যে যে সমস্যাগুলো আমাদের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত হতে দেয় না, তার আলোচনা, সমাধান এবং বাস্তব কিছু উদাহরণ Mark McGuinness এর ব্যক্তি পরিচয় একজন লেখক, কবি অক্সফোর্ড গ্রাজুয়েট এই লেখকের লেখালেখির শুরু পোয়েট্রি দিয়ে, তারপর লিখলেন Resilience সহ Motivation for Creative People এবং Productivity for Creative People বেস্ট সেলার দুটো বই একসময়ের সাইকোথেরাপিস্ট বর্তমানে একুশ বছরের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ ক্রিয়েটিভ প্রফেশনাল কোচ

এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বছরের পর বছর ধরে পৃথিবী জুড়ে কর্পোরেট থেকে একাডেমিক, সাধারণ মানুষ থেকে উৎসাহী ব্যবসায়ী, হাজার হাজার ক্লায়েন্টদের পরামর্শ দাতা, প্রশিক্ষণ দাতা এবং সমস্যা উত্তরণকারীর ভূমিকায় থেকে কাজ করতে গিয়ে অনেক ধারণাই মাথায় আসে তখন তিনি অনলাইনে এধরণের একটি ক্রিয়েটিভ কোর্স চালাচ্ছিলেন আটাশ সপ্তাহ ধরে একদিন চব্বিশতম কোর্সের টপিক হিসাবে দিলেন Resilience , কি করে ক্রিটিসাইজ এবং রিজেকশানকে জয় করতে হবে কোর্স শেষে স্টুডেন্টদের কাছে ফিডব্যাক চাইলেন, কার কোন টপিকটি তাদের ক্রিয়েটিভিটিকে উস্কে দিতে সাহায্য করেছে বেশিরভাগই উত্তর দিলো Resilience ভেবে অবাক হলেন, কতটা গভীরে সমস্যাটি মানুষকে ভুক্তভোগী করি সেটা থেকে সিদ্ধান্ত নিলেন বিষয়ে আরো বিস্তারিত বই আকারে লিখবেন

ঠিক করলেন আপনি কিছু একটা হতে চান একজন দাবাড়ু, একজন লেখক, কিংবা একজন সংগীত শিল্পী প্রথম বাধাটি কি ভয় নিজের ভেতর ভয় ভাবেন, আপনি কি পারবেন ? ঠিক করলেন একজন ব্যবসায়ী হবো, কিন্তু কিছুই তো জানেন না, তাহলে স্বপ্ন কি করে বাস্তবায়ন করবেন ? যখন কেউ নিজের মধ্যে এমন ডেসটিনেশন ঠিক করে, ভয় এসে তাকে দুটো পথ দেয় প্রথমে ভাবে, হয়তো পারবো, যত ভাবতে থাকেভয় এসে বলেছেড়ে দাও, পারবে না দ্বিতীয়, মনের আরেকটি দিক বলে, পারবোই, শুধু সমস্যা ভয় তা কাটাতে পারছি না, অনিশ্চয়তা আটকে দিচ্ছে তখন বেশিরভাগ মানুষ দুটোর মধ্যে প্রথমটি বেছে নেয় মানুষ স্বপ্নটাকে ছেড়ে দেয়, ছেড়ে দিয়ে যেন বাঁচে ভয়ের জয় হয় “Do something concrete that will take you one step closure to your goal. Even if it’s a small action, notice how it reduce the fear.”
ভয়কে জয় করলেই কি সামনে এগিয়ে যেতে পারবেন ? না, পারবেন না নিজে যা করতে চাইছেন, সেটি শুরু থেকেই আপনার ভালো লাগতে হবে সত্যিকার ভালো লাগা থাকতে হবে সত্যি আপনি আনন্দ উপভোগ করেন কিনা কাজটিতে, এটি পরীক্ষার সময় এই ধাপে একই সাথে এটা এই সময়ের সবচেয়ে বড় পুঁজি যখন বারে বারে প্রত্যাখ্যান হবেন, স্বপ্ন ছেড়ে দিতে চাইবেন, মাঝপথে হাল ছেড়ে দেবেন, আপনার কাজটিতে আনন্দ পাওয়া, একান্ত ভালোলাগাটা আপনাকে প্রত্যাখ্যানের ক্লান্তি থেকে বাঁচাবে, মাঝপথে ফিরে যাওয়া থেকে সামনে পথ চলাবে ভয়ের জয়ে ভালো লাগা পথের শক্তি হয়ে দাঁড়াবে

প্রত্যাখ্যানকে প্রত্যাখ্যান করা পৃথিবীর কঠিন কাজের একটি প্রতিটি মানুষই জীবনের কোথাও না কোথাও অস্বীকৃতির মুখোমুখি হয় তখন নিজের যোগ্যতা, ক্ষমতাকে নিজেরাই খাটো করে দেখতে থাকে কখনো কষ্ট পেয়ে, কখনো ব্যর্থ ভেবে, কখনো আর পারছি না ভেবে নিজেদেরকে থামিয়ে দেয় লক্ষ্যের পথ থেকে উঠিয়ে নেয় ভালো লাগার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে যখন কদম আরো সামনে তখন ভাবতে হবে যেচারপাশের অস্বীকৃতির পরেও মঞ্জিলে যাবার পথটুকু ধরে রাখতে হবে এখনোই নিরাশ হয়ে সব ছেড়ে দেবেন না প্রত্যাখ্যান মানে ব্যর্থতা নয়, এটা যাত্রা পথে একটুখানি ইঞ্জিনে গোলযোগ দেখা দেয়া সামনে যত এগিয়ে যাবেন, ব্যর্থতার গ্লানি তত ফিকে হতে থাকবে ভয়ের পরে ভালো লাগার মূলধন, প্রত্যাখ্যানের কাঁটার পথ মাড়িয়ে এখন আপনি অনেকটা সামনে

সাপ দেখলে ভয় পান ? স্নেকের উপর কিছু ডকুমেন্টারি দেখুন, চিড়িয়াখানায় গিয়ে কিছু সাপ দেখুন ধীরে ধীরে ভীতিটা কমতে থাকবে যে জিনিস যত ভয় ধরায়, তার মুখোমুখি যত হতে থাকবেন, আতঙ্ক তত কমতে থাকবে এটাকেই লেখক বলেছেন, desensitization সমালোচনা তখন আপনার সাপে বর যত মুখোমুখি হবেন, ভয় না পেয়ে ভাববেন এটা আপনাকে আরো শক্তিশালী করছে

লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ছবি আঁকার পর উল্টো করে আয়নায় দেখতেন একটি ছবি যখন আঁকতে থাকেন, সেটি চিন্তায় এতটা দখল করে থাকে যে, সহজে তার ভুলগুলো চোখে পড়ে না যতবারই দেখেন, মনে হবে সব যেন ঠিক আছে ভিঞ্চি আয়নায় দেখে, ছবিটি মাথায় যে ভাবে গেঁথে আছে, তাকে ভিন্ন অবস্থায় দেখলে কেমন লাগে, ওই অবস্থাতেই ধরতেন অসামঞ্জস্যগুলো কোনো কাজ কিছুদূর করার পর যতটা সম্ভব কিছুদিন কাজটি থেকে দূরে থাকা সময়ের এই দূরত্ব কাজটিকে ভিন্ন ভাবে দেখতে সাহায্য করে যে ভয়, যে ভীতি, যে প্রত্যাখ্যান, যে সমালোচনা দিনে দিনে ক্লান্ত করে দিচ্ছে, ভালো লাগাটাও যেন ফুরিয়ে যাচ্ছে, নিজের ভেতরের চোখ যেন বন্ধ, এমন অসময়টিতে না কাজ করা যায়, না কাজের ভুল ধরা যায়, না সামনে এগিয়ে চলা যায় যে কোনো লেখা যখন লেখা হয়, তার আবেদন এক, কিছুদিন পর নিজের সেই একই লেখা পড়তে গেলে অনেক ভুল চোখে পড়ে, যাকে ধারালো ভেবেছিলো, তাকে ব্ল্যান্ট মনে হয়, যাকে উজ্জ্বল মনে হয়েছিল, তাকে ফিকে মনে হয় লেখকদের ভালো পাণ্ডুলিপি তৈরির টিপস হচ্ছে কিছুদিন সেই লেখা থেকে দূরে থাকে, সেই লেখার মুখোমুখি না হওয়া যখন মনে হবে লেখাটি ভুলে গেছেন, বের করে আনেন, পড়েন, জহুরি চোখে ধরা দেবে কোথায় কোথায় ময়লার আবরণে ঢাকা ছিল একটি দীর্ঘ পথের যাত্রায় এমন বিরতি সামনের চলাটিতে শক্তি যোগায়

স্বপ্ন মানে একটি বিন্দু, একটি পরিকল্পনা শুধু নয় স্বপ্ন একটি যাত্রা পথে কাঁটা, ভয়, সমালোচনা, প্রত্যাখ্যান সবগুলোই স্বপ্নকে ধরার ধাপ, বাস্তবায়নের সিঁড়ি থেমে না গিয়ে পথটুকু চলা, ধারাবাহিকতা রাখা, অন্যের চেয়ে নিজেকে সমালোচনায় আয়নায় রেখে সংশোধন করে নেয়ার মধ্যে দিয়ে যে কেউ জয় করতে পারে Resilience , পরিবর্তন করতে পারে নিজেকে, যখন যেটুকু দরকার পথে পথে

লেখার স্টাইল সহজ, কিন্তু গভীরে নয় দুশো পঁচাশি পৃষ্ঠার বইটিতে উদাহরণগুলো বিশ্লেষণকে ধরতে সাহায্য করে তবে বিরক্তিকর এবং বেশীমাত্রায় নয় যে কোনো একটি স্টেপের পরামর্শ আপেক্ষিক, তীক্ষ্ণ নয় রকম সেলফ হেল্প বইয়ে বাজার সয়লাব কিন্তু বইটিতে অনেক বিষয়ে একটু একটু না লিখে প্রত্যাখ্যান এবং সমালোচনাকে ঘিরে সৃজনশীল কাজের বাধাগুলোকে জয় করবার পথ বাতলে দিয়েছে লেখক থেকে আইডিয়াস সন্ধানকারী, মিডিয়া থেকে দৈনন্দিন জীবনের চৌহদ্দি তে নিজেকে বুঝতে বইটি যেন একটি ভালো আয়না

লেখক পরিচিতিঃঅপূর্ব চৌধুরী। চিকিৎসক এবং লেখক।উল্লেখযোগ্য বইঃঅনুকথাঃমন।দর্শন।জীবন।